১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত মোবাইল ফোনের বাজারে একক আধিপত্য ছিল নকিয়ার। তবে ২০০৭ সালে আইফোনের আগমনের পর এবং পরবর্তী সময়ে অ্যান্ড্রয়েড ফোনের বাজার দখলের কারণে নকিয়া ধীরে ধীরে পিছিয়ে পড়তে থাকে, যা একসময় প্রতিষ্ঠানটির পুরো মোবাইল ব্যবসাকে প্রভাবিত করে।
তবে গত বছর নকিয়া নতুন শক্তি নিয়ে ফিরে আসে। ক্লাউড সার্ভিস ও ডাটা সেন্টারের জন্য প্রয়োজনীয় হার্ডওয়্যার সরবরাহের ক্ষেত্রে নকিয়ার সক্ষমতা চোখে পড়ে বিশ্বের শীর্ষ চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এনভিডিয়ার। এর পরই নকিয়ায় ১ বিলিয়ন বা ১০০ কোটি ডলারের বিনিয়োগের ঘোষণা দেয় কোম্পানিটি।
ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের বিশ্লেষণ বলছে, দুই কোম্পানির এ উদ্যোগের মাধ্যমে নকিয়া শুধু বাজারে পুনরায় শক্ত অবস্থান গড়বে না, বরং ক্লাউড ও ডাটা সেন্টার প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও নিজেদের গুরুত্ব বাড়াবে।
প্রযুক্তি বিশ্বে বড় ধরনের এক পরিবর্তনের সংকেত দিয়ে গত অক্টোবরে নকিয়ায় ১ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনার কথা জানায় এনভিডিয়া। টেলিকম নেটওয়ার্কগুলোয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের ব্যবহার নিশ্চিত করতে দুই প্রতিষ্ঠান একটি কৌশলগত অংশীদারত্বে আবদ্ধ হয়।
নকিয়ার বর্তমান প্রধান নির্বাহী জাস্টিন হটার্ড বলেন, ‘নকিয়া বরাবরই পুরনো সমস্যা পেছনে ফেলে সমসাময়িক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় নিজেদের নতুন করে গড়ে তুলতে দক্ষ। এনভিডিয়ার সঙ্গে চুক্তির ফলে ভবিষ্যৎ মোবাইল নেটওয়ার্ক আরো স্মার্ট ও শক্তিশালী হবে বলে আশা করা হচ্ছে।’
নকিয়ার শুরুটা হয়েছিল ১৮৬৫ সালে একটি কাগজকল হিসেবে। এরপর কোম্পানিটি রাবার বুট, টেলিভিশন ও বিশ্বখ্যাত মোবাইল ফোন বিক্রি করেছে অনেক বছর। প্রতিবেদন বলছে, প্রতিষ্ঠানটি এখন এআই খাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে শুরু করেছে। দীর্ঘ সময় ধরে একের পর এক ভিন্ন শিল্পে সফলভাবে নিজেদের মানিয়ে নেয়ার এ দক্ষতা বিশ্লেষক ও শিল্প বিশেষজ্ঞদের প্রশংসা কুড়াচ্ছে।
সিসিএস ইনসাইটের প্রধান বিশ্লেষক বেন উড নকিয়ার এ দীর্ঘ পথচলা ও হার না মানাকে ‘অসাধারণ’ বলে অভিহিত করেছেন। প্রায় ২০ বছর ধরে মোবাইল ফোনের বাজারে নকিয়ার যে রাজত্ব ছিল, তার মূলে ছিল ‘জিএসএম’ প্রযুক্তি। নকিয়াই প্রথম টু-জি নেটওয়ার্ক প্রযুক্তিকে দ্রুত গ্রহণ করেছিল, যা আজকের আধুনিক মোবাইল যোগাযোগের ভিত্তি তৈরি করেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নকিয়ার কি-বোর্ড যুক্ত ছোট পর্দার ফোনগুলোই মূলত সাধারণ মানুষের মাঝে টেক্সট মেসেজিং বা এসএমএস আদান-প্রদানের নতুন এক যুগের সূচনা করেছিল। ওই সময় ‘দ্য ম্যাট্রিক্স’ থেকে শুরু করে ‘চার্লি’স অ্যাঞ্জেলস’-এর মতো হলিউডের ব্লকবাস্টার সিনেমাগুলোয় নকিয়ার হ্যান্ডসেট বিশেষভাবে প্রদর্শিত হয়।
আইফোনের আগমনে ফোন ব্যবসা হারানোর পর নকিয়া মূল নজর সরিয়ে নেয় টেলিকম নেটওয়ার্ক ও ক্লাউড অবকাঠামোর দিকে। ২০১৫ সালে ১ হাজার ৫৬০ কোটি ইউরোয় ‘অ্যালকাটেল-লুসেন্ট’ কেনার মতো সাহসী সিদ্ধান্ত কোম্পানির নেটওয়ার্ক ব্যবসার ভিত শক্ত করে।
প্রতিষ্ঠানটিকে ‘এআই সুপারসাইকেল’-এর উপযোগী করে তোলার চেষ্টা করছেন সিইও জাস্টিন হটার্ড। তিনি জানান, বর্তমানে প্রতি বছর ডাটা সেন্টারগুলোর পেছনে বিশ্বজুড়ে যে শত শত কোটি ডলার খরচ হচ্ছে, সে বাজারের একটি বড় অংশ দখলের লক্ষ্য নকিয়ার।
বিশ্লেষকরা বলছেন, আইফোনের কাছে হেরে গিয়ে নকিয়া শেষ হয়ে যায়নি, বরং ফোন তৈরির ব্যবসা ছেড়ে টেলিকম নেটওয়ার্ক ও এআই প্রযুক্তির পেছনের মূল যন্ত্রাংশ তৈরির বিশাল এক ব্যবসায়িক শক্তিতে পরিণত হয়েছে ফিনল্যান্ডভিত্তিক কোম্পানিটি।






















