দীর্ঘদিনের বিরতি কাটিয়ে ফের ব্যবসায়িক সম্পর্ক পুনর্গঠন করছে দুই মার্কিন প্রযুক্তি জায়ান্ট অ্যাপল ও ইন্টেল। গত শুক্রবার ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের (ডব্লিউএসজে) প্রতিবেদনে জানানো হয়, অ্যাপলের ডিভাইসের জন্য চিপ তৈরি করতে ইন্টেল একটি প্রাথমিক চুক্তিতে পৌঁছেছে। পদক্ষেপটি ইন্টেলের চুক্তিভিত্তিক চিপ উৎপাদন ব্যবসার জন্য একটি বড় মাইলফলক হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। খবর রয়টার্স।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চুক্তিটির জন্য দুই কোম্পানির মধ্যে গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে আলোচনা চলছিল। কয়েক মাস আগে একটি আনুষ্ঠানিক চুক্তির রূপরেখা চূড়ান্ত হয়। এ খবরের পর শেয়ারবাজারে ইন্টেলের উত্থান দেখা গেছে। গত শুক্রবার প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারদর প্রায় ১৫ শতাংশ বেড়েছে। অন্যদিকে অ্যাপলের শেয়ারদর বেড়েছে প্রায় ১ দশমিক ৭ শতাংশ ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অ্যাপলের মতো বড় গ্রাহককে পাওয়া ইন্টেলের জন্য অত্যন্ত সম্মানের। এটি ইন্টেলের সুনাম যেমন বাড়াবে, তেমনি কোম্পানির উৎপাদন ব্যবসায় স্থিতিশীলতা আনবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, গত কয়েক বছরে চিপ তৈরির দৌড়ে তাইওয়ানের টিএসএমসির কাছে ইন্টেল কিছুটা পিছিয়ে পড়ে। এখন অ্যাপলের কার্যাদেশ পেলে চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটি পুনরায় শক্ত অবস্থানে ফিরতে পারবে।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল বলছে, অ্যাপলকে আলোচনার টেবিলে আনতে মার্কিন সরকার বড় ভূমিকা পালন করেছে। যদিও সরকারের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা সরাসরি এ চুক্তির কথা স্বীকার করেননি, তবে তিনি জানান, প্রশাসন ইন্টেলকে শক্তিশালী করতে কাজ করে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা ইন্টেলের জন্য নতুন ব্যবসার সুযোগ তৈরির চেষ্টা করছি। প্রতিষ্ঠানটি যুক্তরাষ্ট্রের একটি অন্যতম প্রধান সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদক হওয়ায় সরকার তাদের সহায়তা করছে। এ সমঝোতা ট্রাম্প প্রশাসনের লক্ষ্য অর্জনেও সহায়ক হবে। কারণ তারা আমেরিকায় চিপ উৎপাদন বাড়াতে চায়।’
বর্তমানে অ্যাপল চিপের জন্য মূলত টিএসএমসির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু টিএসএমসির ওপর এনভিডিয়া ও এএমডির মতো এআই চিপ নির্মাতাদেরও প্রচুর চাপ রয়েছে।
অ্যাপলের প্রধান নির্বাহী টিম কুক সম্প্রতি জানান, সরবরাহ সংকটের কারণে আইফোন বিক্রিতে প্রভাব পড়ছে। তাই ইন্টেলের সঙ্গে চুক্তি করলে অ্যাপলের উৎপাদন উৎস বা সাপ্লাই চেইন আরো বৈচিত্র্যময় হবে।
তবে ইন্টেল ঠিক কোন ডিভাইসের চিপ তৈরি করবে, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ইন্টেল ও অ্যাপল উভয় পক্ষই এ বিষয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, চুক্তিটি দুই কোম্পানির জন্য একটি পুনর্মিলনও বটে। কয়েক বছর আগে অ্যাপল ম্যাক কম্পিউটার থেকে ইন্টেলের প্রসেসর সরিয়ে নিজস্ব ‘অ্যাপল সিলিকন’ ব্যবহার শুরু করে। এখন আবার কোম্পানি দুটি উৎপাদনের ক্ষেত্রে হাত মেলাচ্ছে।
বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইন্টেলের সিইও লিপ-বু তান কোম্পানিটিকে আমূল বদলে ফেলার চেষ্টা করছেন। গত এক বছরে তিনি মার্কিন সরকারের পাশাপাশি এনভিডিয়া ও সফটব্যাংকের বিনিয়োগও নিশ্চিত করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য সচিব হাওয়ার্ড লাটনিক ব্যক্তিগতভাবে টিম কুক, ইলোন মাস্ক ও জেনসেন হুয়াংয়ের মতো শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করে ইন্টেলের সঙ্গে কাজ করার অনুরোধ জানান। স্থানীয় চিপ উৎপাদন বাড়িয়ে বিদেশের ওপর নির্ভরতা কমানোর জাতীয় পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। নতুন চুক্তিটি তারই একটি বড় অংশ হতে যাচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, অ্যাপল দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে একক সরবরাহকারীর ওপর নির্ভরতা কমাতে চায়। বিশ্বব্যাপী চিপ সংকট ও যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদন বাড়ানোর চাপের কারণে প্রতিষ্ঠানটি এখন নতুন বিকল্প খুঁজছে।
উল্লেখ্য, ইন্টেল গত ফেব্রুয়ারিতে জানায়, কোম্পানিটি এখন থেকে নিজস্ব ‘গ্রাফিকস প্রসেসিং ইউনিট’ বা জিপিইউ উৎপাদন শুরু করবে।
বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, একসময় সিপিইউ বাজারে প্রায় একচেটিয়া আধিপত্য ছিল ইন্টেলের হাতে। সে সময় ইন্টেলের প্রতিদ্বন্দ্বী তেমন কেউ ছিল না। তাই কোম্পানির নতুন প্রজন্মের প্রসেসরে বড় ধরনের পরিবর্তন বা পরিমার্জনের প্রয়োজন হতো না। ২০ বছর আগে ও ইন্টেল এতটাই শক্তিশালী ছিল যে প্রায় ২ হাজার কোটি ডলারে এনভিডিয়া কিনে নেয়ার কথা ভেবেছিল।




















