জনসাধারণের কাছে প্রকাশের আগেই গুগলের অভ্যন্তরীণ ডেটাবেস থেকে সার্চ ডেটা চুরি করে প্রেডিকশন বা ভবিষ্যদ্বাণী করার বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্ম ‘পলিমার্কেট’-এ বাজি ধরার অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছেন সার্চ জায়ান্টটির এক শীর্ষ তথ্য-নিরাপত্তা প্রকৌশলী। ইনসাইডার ট্রেডিং বা কোম্পানির ভেতরের গোপন তথ্য ব্যবহার করে কেবল কয়েক মাসেই ওই কর্মী পলিমার্কেট থেকে প্রায় ১২ লাখ মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় যা ১৪ কোটি টাকারও বেশি) হাতিয়ে নিয়েছেন বলে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি।
নিউ ইয়র্কের সাউদার্ন ডিস্ট্রিক্টের ইউএস অ্যাটর্নির কার্যালয় জানিয়েছে, অভিযুক্ত গুগল প্রকৌশলীর নাম মিশেল স্প্যাগনুওলো। ইতালির নাগরিক স্প্যাগনুওলো দীর্ঘদিন ধরে সুইজারল্যান্ডে বসবাস করলেও গত বুধবার নিউ ইয়র্ক থেকে তাকে ফেডারেল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই) গ্রেপ্তার করে। পরবর্তীতে তাকে সাড়ে ২২ লাখ ডলারের বিশাল মুচলেকায় জামিনে মুক্তি দেওয়া হয়েছে।
যেভাবে চলতো জালিয়াতি
অনলাইন প্রোফাইল অনুসারে, মিশেল স্প্যাগনুওলো দীর্ঘ ১২ বছরেরও বেশি সময় ধরে গুগলে একজন ইনফরমেশন সিকিউরিটি প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। মার্কিন বিচার বিভাগ জানিয়েছে, তিনি ২০২৪ সালে প্রথম ক্রিপ্টোকারেন্সি-ভিত্তিক বেটিং প্ল্যাটফর্ম পলিমার্কেট ব্যবহার করা শুরু করেন।
গুগলের শীর্ষ পদে থাকার সুবাদে কোম্পানির ট্রেন্ডিং ও বৈশ্বিক সার্চ ডেটা জনসাধারণের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে অবমুক্ত করার আগেই তা সবার আগে জানার বিশেষ আইনি সুযোগ ছিল স্প্যাগনুওলোর। আদালতের নথি অনুসারে, গেল বছরের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে তিনি গুগলসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ বিষয়ের ওপর পলিমার্কেটে প্রায় ২৭ লাখ ডলারের বাজি ধরেন এবং গোপন তথ্য আগে থেকে জানার কারণে খুব সহজেই ১০ লাখ ডলারেরও বেশি মুনাফা তুলে নেন।
বিয়াঙ্কা ও ট্রাম্পের বিপক্ষে বাজি, ‘ডিফোরভিডি’-তে বাজিমাত
তদন্তকারী কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, পলিমার্কেটে স্প্যাগনুওলোর সবচেয়ে লাভজনক বাজিটি ছিল ২০২৫ সালে গুগলে বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বেশি সার্চ করা ব্যক্তি কে হবেন—তা সঠিকভাবে অনুমান করা।
সাধারণ মানুষ যখন বিয়াঙ্কা সেনসোরি কিংবা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের মতো বহুল আলোচিত নামগুলোর ওপর বাজি ধরছিলেন, স্প্যাগনুওলো তখন কৌশলগতভাবে ওই নামগুলোর বিপক্ষে অবস্থান নেন। তিনি বাজি ধরেন যে, গায়ক ‘ডিফোরভিডি’ (যিনি বর্তমানে এক কিশোরীকে হত্যার অভিযোগে কারাগারে বন্দি) গুগলে প্রথম স্থান অধিকার করবেন।
যে সময়ে তিনি এই বাজিটি ধরেছিলেন, তখন বেটিং প্ল্যাটফর্মটিতে ‘ডিফোরভিডি’র প্রথম হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় শূন্যের কাছাকাছি ছিল। অথচ স্প্যাগনুওলো গুগলের অভ্যন্তরীণ ডেটা টুল ব্যবহার করে আগে থেকেই নিশ্চিত ছিলেন যে, ট্রেন্ড অনুযায়ী ডিফোরভিডি-ই গুগলের শীর্ষ সার্চ করা ব্যক্তি হতে যাচ্ছেন।
অ্যাকাউন্ট শনাক্ত করল এফবিআই
পলিমার্কেটে ‘আলফার্যাকন’ (AlphaRaccoon) নামের একটি মূল অ্যাকাউন্ট এবং আরও বেশ কয়েকটি ছদ্মনামীয় অ্যাকাউন্ট থেকে ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহার করে বাজি ধরতেন স্প্যাগনুওলো। শুরুতে ছদ্মনামীয় অ্যাকাউন্টগুলোর মালিক খুঁজে পাওয়া কঠিন হলেও, তিনি তার একটি অ্যাকাউন্ট নিজের আসল ইতালীয় পরিচয়পত্র (ID) দিয়ে খুলেছিলেন। এফবিআই প্রথম সেই অ্যাকাউন্টটির সন্ধান পায় এবং ব্লকচেইন ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে তার সবগুলো অ্যাকাউন্টের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে তাকে শনাক্ত করতে সক্ষম হয়।
এ বিষয়ে পলিমার্কেটের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, তদন্তের স্বার্থে তারা মার্কিন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সম্পূর্ণ সহযোগিতা করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, “ব্লকচেইন ট্রেডিং সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও সন্ধানযোগ্য এবং এখানে অপরাধীরা ডিজিটাল খতিয়ানে নিজেদের অপরাধের ছাপ রেখেই যায়।”
গুগলের প্রতিক্রিয়া
এ বিষয়ে গুগলের একজন মুখপাত্র বিবিসিকে জানিয়েছেন, কোম্পানিটি তদন্তের বিষয়ে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছে এবং অভিযুক্ত প্রকৌশলীকে ইতিমধ্যে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো হয়েছে।
মুখপাত্র আরও স্পষ্ট করেন যে, স্প্যাগনুওলো যেসব অভ্যন্তরীণ তথ্য ব্যবহার করেছেন তা মূলত বিপণন বা মার্কেটিং সংক্রান্ত ছিল এবং এটি সব কর্মীদের জন্য উন্মুক্ত সাধারণ এক ইন্টারনাল টুলের মাধ্যমেই প্রবেশযোগ্য ছিল। তবে গুগলের স্পষ্ট নীতি অনুযায়ী, বাজি ধরার মতো ব্যক্তিগত আর্থিক লাভের উদ্দেশ্যে কোম্পানির গোপন তথ্য ব্যবহার করা তাদের নীতিমালার একটি গুরুতর লঙ্ঘন।
এই জালিয়াতি ও ইনসাইডার ট্রেডিংয়ের বিষয়ে বিবিসির পক্ষ থেকে মন্তব্যের অনুরোধ করা হলেও মিশেল স্প্যাগনুওলোর পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। সিলিকন ভ্যালির ইতিহাসে গুগলের মতো শীর্ষ টেক জায়ান্টের অভ্যন্তরীণ ডেটা অপব্যবহারের এই ঘটনাটি ২০২৬ সালের প্রযুক্তি বিশ্বে ডেটা সিকিউরিটি এবং করপোরেট এথিক্স নিয়ে নতুন করে বড় বিতর্ক জন্ম দিয়েছে।




















