চুরির দায়ে গ্রেপ্তার ব্যক্তির জিম্মায়ই ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে প্রায় দেড় কোটি টাকা মূল্যের ১৮৮টি চোরাই মোবাইল ফোন। তদন্ত কর্মকর্তার দেওয়া প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে আদালত এসব আলামত আসামির জিম্মায় দেওয়ার আদেশ দেন। তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মালিকানা প্রমাণে আদালতে দাখিল করা ক্রয় রসিদগুলোর বেশিরভাগই ভুয়া। ফলে আইনি ফাঁকফোকর গলে জব্দ করা ফোনসহ আসামির পার পেয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা।
ঘটনার সূত্রপাত ২০২৩ সালে। ভারতের চেন্নাইয়ে চিকিৎসা নিতে গিয়ে কেরালার বাসিন্দা শাহীন রোশান নামে এক মেডিকেল শিক্ষার্থীর আইফোন চুরি করেন দুই বাংলাদেশি। ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী বিষয়টি বাংলাদেশ দূতাবাসকে জানালে তৎপর হয়ে ওঠে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ। পরবর্তীতে রাজধানী থেকে চুরি যাওয়া সেই আইফোনটি উদ্ধারসহ এই চক্রের মূল হোতা দুই ভাই—শাকিল ও শাহিনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
অভিযানকালে ওই চোরাই আইফোন ছাড়াও ১৩৮টি আইফোনসহ বৈধ কাগজপত্রবিহীন মোট ২০৭টি বিভিন্ন মডেলের মোবাইল ফোন জব্দ করে পুলিশ। এই ঘটনায় বিশেষ ক্ষমতা আইনে পুলিশ বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের করে। রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে দুই সহোদর শুল্ক ফাঁকি দিয়ে চোরাই পথে মোবাইল আমদানির কথা স্বীকারও করেছিলেন।
তবে ২০২৪ সালে মামলা চলাকালীন নাটকীয়ভাবে মোড় ঘোরে ঘটনার। আদালতের আদেশে জব্দকৃত ২০৭টি মোবাইলের মধ্যে ১৮৮টি মোবাইল, ঘষামাজা করা একটি ম্যাকবুক এবং মোবাইল বিক্রির ৯৪ হাজার টাকা নিজের জিম্মায় নিয়ে নেন মূল অভিযুক্ত শাকিল। মালিকানা দাবি করে আদালতে কিছু কেনাকাটার ইনভয়েস বা রসিদ জমা দেন তিনি।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, আদালতে জমা দেওয়া সেসব ক্রয় রসিদে উল্লেখিত মোবাইল নম্বরগুলোর বেশিরভাগই বন্ধ। আর যেসব নম্বর সচল রয়েছে, তাদের কেউই শাকিলকে চেনেন না। রসিদে নাম থাকা শ্রাবণ নামের এক ব্যক্তি জানান, ২০২৩ সালে তিনি কোনো আইফোন ১৩ কেনেননি এবং ওই রসিদে তাঁর নম্বর কীভাবে গেল তা তিনি জানেন না। একই ঘটনা পাবনার ঈশ্বরদীর আবির হোসেনের ক্ষেত্রেও। বসুন্ধরা সিটি থেকে কোনো মোবাইল কেনা বা মেরামতের কথা সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন তিনি।
কোনো যাচাই-বাছাই ছাড়াই কীভাবে চোরাই মোবাইলগুলো আসামির হাতে ফেরত গেল—জানতে চাইলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উপ-পরিদর্শক (এসআই) শফিউল আলম সোহাগ বলেন, “ওনারা কাগজপত্র দেখিয়ে মোবাইলগুলো নিয়ে গেছেন। বিষয়টি যাচাই করে আদালত থেকেই দেওয়া হয়েছে।” অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষ দাবি করছে, আদালতে দাখিল করা পুলিশের চার্জশিট ও প্রতিবেদনের বাইরে যাওয়ার সুযোগ তাদের নেই।
মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন থাকায় আদালতে হাজির হওয়া প্রধান আসামি শাকিল চোরাই ব্যবসার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “পুলিশ এসব বানিয়ে লিখেছে। আমাদের কাছে মেরামতের জন্য আসা ফোনও ছিল সেখানে। পুলিশ আমাদের কাছ থেকে যে ফোনগুলো জব্দ করেছিল, সেগুলোর কিছু পরিবর্তন করে আমাদের ভাঙাচোরা ফোন ফেরত দেওয়া হয়েছে।” উল্টো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে ফোন হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ তোলেন তিনি।
ভারতীয় নাগরিকের আইনজীবী শ্রী প্রাণ নাথ এই প্রক্রিয়ার তীব্র সমালোচনা করে বলেন, “আইএমইআই (IMEI) নম্বর পরীক্ষা করলে প্রকৃত মালিককে শনাক্ত করা সম্ভব ছিল। কিন্তু তা না করেই, লক করা এবং আইএমইআই বিহীন মোবাইলগুলো একজনের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে কীভাবে ফেরত দেওয়া হলো, তা আমাদের বোধগম্য নয়।”
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জয়নুল আবেদিন মেজবাহ মনে করেন, এই ঘটনায় পর্দার আড়ালে বড় ধরনের যোগসাজশ রয়েছে। তিনি বলেন, “তদন্ত কর্মকর্তার দুর্বল প্রতিবেদনের কারণে ১৮৮টি মোবাইল আবার সেই কালোবাজারির হাতেই তুলে দেওয়া হয়েছে। চোরাই মাল যদি চোরের হাতেই ফিরে যায়, তবে অপরাধীরা পার পেয়ে যাবে এবং ভবিষ্যতে তারাই দেশটাকে লুটে খাবে। এ ধরনের সংবেদনশীল মামলায় রাষ্ট্রপক্ষকে আরও কঠোর ভূমিকা পালন করা উচিত ছিল।”
আদালত সূত্রে জানা গেছে, মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ ইতিমধ্যেই শেষ হয়েছে। চাঞ্চল্যকর এই মামলার রায় যেকোনো দিন ঘোষণা করা হতে পারে।


















