গত দুই দশকে বিশ্বজুড়ে জন্মহার বা প্রজনন হার (Fertility Rate) আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ার পেছনে অর্থনৈতিক ও সামাজিক নানা কারণের কথা জানা থাকলেও, এবার এর নেপথ্যে আধুনিক জীবনের অন্যতম অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী ‘আইফোনের’ এক পরোক্ষ প্রভাব খুঁজে পেয়েছেন গবেষকরা। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ‘গ্লোবাল নিউজ’-এর এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৭ সালে বাজারে অ্যাপলের আইফোনের প্রথম আগমন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের অন্যান্য উন্নত অঞ্চলের জন্মহারের নিম্নমুখী গ্রাফের সাথে অদ্ভুতভাবে মিলে যায়।
সময়ের এই নিখুঁত ও অবিশ্বাস্য মিলটিই যুক্তরাষ্ট্রের ভার্মন্টের ‘মিডলবারি কলেজ’-এর অর্থনীতিবিদ ক্যাটলিন মেয়ার্সকে উদ্বুদ্ধ করেছে আইফোনের উন্মোচন ও বিশ্বব্যাপী জন্মহার কমে যাওয়ার বিষয়ের মধ্যে কোনো বৈজ্ঞানিক সংযোগ আছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে।
এক দশকে জন্মহার কমেছে ২৫ শতাংশ
গবেষক ক্যাটলিন মেয়ার্স বর্তমান জনমিতির এই সংকট নিয়ে বলেন, “বিশ্বজুড়ে জন্মহার কেন এভাবে হু হু করে কমছে? এটি বর্তমান শতকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই ২০০৭ সালের পর থেকে জন্মহার প্রায় এক-চতুর্থাংশ বা ২৫ শতাংশ কমে গেছে।”
মেয়ার্সের এই গবেষণায় মূলত খতিয়ে দেখা হয়েছে— স্ক্রিন টাইম (Screen Time) বা ফোনের পর্দায় কাটানো সময় অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়া এবং ডিজিটাল যোগাযোগের প্রতি মানুষের অতিমাত্রায় ঝুঁকে পড়া কি বাস্তব জীবনের সরাসরি বা শারীরিক যোগাযোগ কমিয়ে দিচ্ছে কি না। যা পরোক্ষভাবে গর্ভধারণের সংখ্যা বা সন্তান জন্মদানের হার কমে যাওয়ার প্রধান মনস্তাত্ত্বিক কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যেভাবে চলল আইফোন বনাম জন্মহারের পরীক্ষা
এই অভিনব ধারণাটি পরীক্ষার জন্য আইফোন বাজারে আসার শুরুর বছরগুলোতে (২০০৭ থেকে ২০১০) যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন কাউন্টি বা অঞ্চলের জন্মহারের পরিসংখ্যান নিবিড়ভাবে বিশ্লেষণ করেছেন মেয়ার্স।
ওই সময় আইফোন ডিভাইসটি কেবল ‘এটিঅ্যান্ডটি’ (AT&T) মোবাইল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে একচেটিয়াভাবে পাওয়া যেত। যার মানে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কিছু অঞ্চলে তখন আইফোন ব্যবহারের সুবিধা বা টাওয়ার ছিল, আবার কিছু প্রত্যন্ত অঞ্চলে তা ছিল না।
গ্রাহকদের আয়, শিক্ষা এবং স্থানীয় জন্মনিরোধক নীতির মতো অন্যান্য প্রভাবক বা ফ্যাক্টরগুলোকে গাণিতিক নিয়ন্ত্রণে রেখে যখন তিনি আইফোন ব্যবহারকারী অঞ্চল ও আইফোনহীন অঞ্চলের মধ্যে তুলনা করেছেন, তখন চমকপ্রদ তথ্য বেরিয়ে আসে। দেখা গেছে, যেসব এলাকায় আইফোনের সহজলভ্যতা ও ব্যবহার বেশি ছিল, সেখানে জন্মহার বাকি অঞ্চলের তুলনায় অত্যন্ত দ্রুত গতিতে কমেছে।
গবেষক মেয়ার্স এই তত্ত্বটি খুব সহজভাবে ব্যাখ্যা করে বলেন: “আমরা লক্ষ্য করেছি, যেসব জায়গায় আইফোন দ্রুত সাধারণ মানুষের হাতে পৌঁছেছিল, সেখানে জন্মহার তুলনামূলকভাবে দ্রুত কমেছে। তত্ত্বটি বেশ সরল—মানুষ অনলাইনে যত বেশি সময় কাটাচ্ছে, বাস্তব জীবনে একে অপরের সঙ্গে নিবিড় সময় কাটানোর সুযোগ ততটাই কমে যাচ্ছে। আপনি যখন কারো সঙ্গে বাস্তবে বা সরাসরি সময় কাটাচ্ছেন না, তখন গর্ভধারণের সম্ভাবনা কমে যাওয়াটাই স্বাভাবিক।”
বৈশ্বিক চিত্র: জনসংখ্যা স্থিতিশীল রাখার হারের নিচে বহু দেশ
বর্তমানে বিশ্বের অধিকাংশ উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে জন্মহার জনসংখ্যা স্থিতিশীল রাখার ন্যূনতম হারের (Replacement Rate, যা প্রতি নারীর বিপরীতে ২.১ জন সন্তান) চেয়েও অনেক নিচে নেমে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্র: বর্তমানে এই হার প্রতি নারীর বিপরীতে প্রায় ১.৬ জন সন্তান।
কানাডা: কানাডায় এই চিত্র আরও উদ্বেগজনক, সেখানে এই হার কেবল ১.২৫ এর কাছাকাছি।
প্রজনন হারের এই নিম্নমুখী গ্রাফ এখন কেবল ধনী বা পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতেও এই ‘বেবি বাস্ট’ (Baby Bust) বা জন্মহারের আকস্মিক পতন রেকর্ড করা হচ্ছে।
স্মার্টফোনই কি একমাত্র কারণ? দ্বিমত বিশেষজ্ঞদের
এত কিছুর পরও সমাজবিজ্ঞানী ও জনসংখ্যা বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, স্মার্টফোন বা আইফোনকে এই পরিস্থিতির একমাত্র বা প্রধান কারণ হিসেবে দাঁড় করানো ঠিক হবে না। ২০০০-এর দশকে বিশ্বজুড়ে বেশ কিছু বড় ধরনের সামাজিক ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিবর্তন ঘটেছিল, যা জন্মহার হ্রাসে বড় ভূমিকা রেখেছে। যার মধ্যে রয়েছে— ২০০৮ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, আবাসন ও জীবনযাত্রার খরচ আকাশচুম্বী হওয়া, নারীদের উচ্চ শিক্ষার হার বৃদ্ধি এবং আধুনিক জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির সহজলভ্যতা।
স্বেচ্ছায় সন্তানহীন (Childfree by choice) থাকার অভিজ্ঞতা নিয়ে কাজ করা বিখ্যাত লেখিকা সেলিয়া চ্যান্ডলার মনে করেন, প্রযুক্তি ও সন্তান না নেওয়ার সিদ্ধান্তের মধ্যে সরাসরি একক সম্পর্ক টানাটা কিছুটা বাড়াবাড়ি। তিনি বলেন:
“প্রযুক্তি মানুষকে সন্তান নেওয়া থেকে দূরে রাখছে এমন দাবি আমার কাছে কিছুটা অতিরঞ্জিত মনে হয়। সাম্প্রতিক দশকগুলোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক পরিবর্তন হচ্ছে— এখনকার মানুষ, বিশেষ করে নারীরা, মা বা বাবা হওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আগের চেয়ে অনেক বেশি স্বাধীন ও ক্ষমতাবান। আমি নিজেকে খুব ভাগ্যবান মনে করি যে আমি এমন এক সময়ে জন্মগ্রহণ করেছি যখন নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্ণ স্বাধীনতা আমার ছিল।”






















