স্মার্টফোনের দুই দশকের ইতিহাসে বড় পরিবর্তনের দাবি নিয়ে নিজেদের প্রথম ফোল্ডেবল হ্যান্ডসেট ‘আইফোন ডুও’ উন্মোচন করেছে অ্যাপল। পাসপোর্টের আকৃতির ফোনটি খুললে পর্দার আকার প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়। ডিভাইসটি তখন ৭ দশমিক ৬ ইঞ্চির ট্যাবলেটে পরিণত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ‘লাক্সারি’ ফোনটির দাম শুরু হচ্ছে ২ হাজার ডলার থেকে। ডুওর সর্বোচ্চ মূল্য ৩ হাজার ডলার ছাড়াতে পারে। আগামী অক্টোবরের শেষের দিকে ফোনটি বাজারে ছাড়বে অ্যাপল।
অনেকের মতে, স্যামসাং, গুগল ও হুয়াওয়ের মতো প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামতেই ফোনটি এনেছে অ্যাপল। একই সঙ্গে বিশ্বজুড়ে অতি ধনী ও সচ্ছল ক্রেতাদের আকৃষ্ট করাও প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম লক্ষ্য বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা।
এমন সময় আইফোন ডুও বাজারে আনা হলো যখন মূল্যস্ফীতি নিয়ে ভোক্তাদের মধ্যে চাপ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে আগস্টে বার্ষিক ভোক্তা মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৩ দশমিক ৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। একই সময় মাসভিত্তিক মূল্যস্ফীতিও বেড়েছে। দেশটির সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আগস্টে ভোক্তা মূল্যসূচক (সিপিআই) আগের মাসের তুলনায় দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে। জুলাইয়ে এ হার ছিল দশমিক ১ শতাংশ।
বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, যুদ্ধ, জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের বাড়তি দামের মধ্যে প্রশ্ন উঠছে— এত উচ্চ দামের ফোন কিনবেন কারা?
বিশ্লেষকদের মতে, এর সম্ভাব্য ক্রেতা মূলত উচ্চ আয়ের মানুষ। কারণ মূল্যস্ফীতি বাড়লেও এ শ্রেণীর মানুষের ব্যয়ক্ষমতায় তুলনামূলক কম চাপ পড়ে। ফলে সাধারণ ভোক্তারা যখন স্মার্টফোন কেনার ক্ষেত্রে দাম ও প্রয়োজনকে বেশি গুরুত্ব দেন, তখন ধনী ক্রেতাদের একটি অংশ নতুন প্রযুক্তি, নকশা ও ব্র্যান্ডের জন্য বাড়তি অর্থ খরচ করতে পারেন।
আইফোন ডুওর ক্ষেত্রে শুধু ফোনের ব্যবহারিক সুবিধাই নয়, নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের আগ্রহও বড় কারণ হতে পারে। ফোনটি ভাঁজ করে ছোট আকারে রাখা যায়। আবার খুললে বড় পর্দায় ভিডিও দেখা, কাজ করা বা একাধিক কাজ করার সুবিধা পাওয়া যাবে। ফলে যারা স্মার্টফোন ও ট্যাবলেটের সুবিধা এক ডিভাইসে চান, তাদের কাছেও এটি আকর্ষণীয় হতে পারে।
এর সঙ্গে যুক্ত হবে অ্যাপলের ব্র্যান্ডমূল্য। অ্যাপলের নতুন পণ্য সাধারণত প্রযুক্তিপ্রেমী ও উচ্চ ব্যয়ের সক্ষমতা থাকা ক্রেতাদের কাছে আলাদা আকর্ষণ তৈরি করে। প্রথম প্রজন্মের ফোল্ডেবল আইফোন হওয়ায় ক্রেতারাও আগ্রহ দেখাতে পারেন। বিশেষ করে যারা প্রযুক্তি পণ্যকে ব্যক্তিগত পছন্দ ও সামাজিক অবস্থানের অংশ হিসেবে দেখেন, তাদের কাছে ২ হাজার ডলারের দাম বড় বাধা নাও হতে পারে।
বিশ্বজুড়ে স্মার্টফোন বিক্রি কমার পূর্বাভাসের মধ্যেই অ্যাপল এমন একটি প্রিমিয়াম ফোন বাজারে এনেছে। ফলে আইফোন ডুও দিয়ে বিপুলসংখ্যক ক্রেতা টানা নয়, বরং উচ্চ দামের বাজারে বেশি ব্যয় করতে সক্ষম ক্রেতাদের কাছে আয় বাড়ানোই অ্যাপলের কৌশল হতে পারে।
আইফোন ডুওর পাশাপাশি আইফোন ১৮ প্রো, আইফোন ১৮ প্রো ম্যাক্স, এআই-চালিত নতুন সিরি ব্যবস্থা ও অ্যাপল ওয়াচ ১২ বাজারে আনার ঘোষণা দিয়েছে অ্যাপল। অর্থাৎ নতুন পণ্যগুলোর মধ্যে আইফোন ডুও সবচেয়ে ব্যয়বহুল শ্রেণীর ক্রেতাদের লক্ষ্য করে বাজারজাত করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সময় ২ হাজার ডলারের ফোন সবার জন্য নয়। বরং এর সম্ভাব্য ক্রেতা সে ভোক্তারা, যাদের হাতে বাড়তি ব্যয়ের সক্ষমতা আছে ও যারা নতুন প্রযুক্তি ও প্রিমিয়াম ব্র্যান্ডের জন্য অর্থ ঢালতে প্রস্তুত।
অ্যাপলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর জন টার্নাসের নেতৃত্বের এটিই প্রথম বড় উন্মোচন। ডিভাইসটি নিয়ে সিইও জন টার্নাস বলেন, ‘মানুষের দৈনন্দিন জীবনে যে ডিভাইস সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, তার ডিসপ্লে আরো বড় হলে কাজের পরিধি বহুগুণ বেড়ে যায়। এ সুবিধা দেয়ার জন্য ভাজযোগ্য বা ফোল্ডেবল ডিজাইনই সেরা সমাধান।’




















