বাংলাদেশের পারমাণবিক বিদ্যুৎ কর্মসূচিতে ছোট মডুলার রিঅ্যাক্টর (এসএমআর) প্রযুক্তি যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বাগেরহাটের মংলা বন্দরের কাছে পরিকল্পিত চীন-বাংলাদেশ মংলা বন্দর অর্থনৈতিক অঞ্চলের পাশে ১০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি ছোট পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছে চীন।
প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশে এসএমআর প্রযুক্তি ব্যবহারের এটি প্রথম প্রকল্প হতে পারে। প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, উৎপাদিত বিদ্যুতের বড় অংশ মংলা অর্থনৈতিক অঞ্চলের চাহিদা পূরণে ব্যবহার করা হবে। অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের জন্য বাংলাদেশকে বিক্রির সম্ভাবনাও রয়েছে।
তবে মংলায় এসএমআর নির্মাণের প্রস্তাবটি এখনো সরকারের অনুমোদিত কোনো প্রকল্প নয়। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে প্রাথমিক পর্যায়ে আলোচনা চলছে।
চীনা প্রতিনিধিদলের সঙ্গে আলোচনা
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আগস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (BAERA) সঙ্গে চীনা একটি প্রতিনিধিদলের বৈঠকে মংলায় এসএমআর স্থাপনের বিষয়টি আলোচনায় আসে।
বৈঠকে বাংলাদেশ ও চীনের আটজন করে কর্মকর্তা অংশ নেন। চীনের চারজন বিশেষজ্ঞ এসএমআর প্রযুক্তির বিভিন্ন দিক এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের সম্ভাব্য কাঠামো তুলে ধরেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশের অবস্থান ও আগ্রহ সম্পর্কেও জানতে চাওয়া হয়।
প্রাথমিক আলোচনায় প্রকল্পের জন্য বিনা মূল্যে জমি দেওয়ার বিষয়টিও উঠে আসে। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম আমদানিতে শুল্ক ছাড় দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
এসএমআর প্রযুক্তিতে বাংলাদেশের দক্ষতা তৈরির জন্য প্রকল্পে স্থানীয় কর্মী নিয়োগের প্রস্তাবও দিয়েছে বাংলাদেশ। এ ছাড়া মংলা নদীর ওপর একটি সেতু নির্মাণের বিষয়েও চীনের কাছে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
অর্থনৈতিক অঞ্চলের বিদ্যুৎ চাহিদা মেটানোর লক্ষ্য
বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের এক কর্মকর্তা জানান, মংলায় প্রস্তাবিত এসএমআর অর্থনৈতিক অঞ্চলের বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তিনি বলেন, অর্থনৈতিক অঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য সেখানে একটি নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা থাকলে তা উভয় দেশের জন্যই সুবিধাজনক হতে পারে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, অর্থনৈতিক অঞ্চলের চাহিদা মেটানোর পর অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হতে পারে।
এসএমআর কী
ছোট মডুলার রিঅ্যাক্টর বা এসএমআর হলো তুলনামূলক কম ক্ষমতার পারমাণবিক রিঅ্যাক্টর, যেগুলো বড় প্রচলিত পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের তুলনায় ছোট আকারে এবং মডুলার কাঠামোয় স্থাপনের জন্য নকশা করা হয়।
চীন, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি দেশ এসএমআর প্রযুক্তির উন্নয়ন ও বাণিজ্যিক ব্যবহারে কাজ করছে। চীনের ১০০ মেগাওয়াট শ্রেণির এসএমআর প্রযুক্তির মধ্যে লিংলং ওয়ান (ACP100) অন্যতম আলোচিত প্রকল্প।
বাংলাদেশের জন্য এসএমআর প্রযুক্তির সম্ভাব্য সুবিধার মধ্যে তুলনামূলক ছোট আকারের বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন, নির্দিষ্ট শিল্পাঞ্চল বা বিদ্যুৎ চাহিদাকেন্দ্রের কাছে উৎপাদন এবং ধাপে ধাপে পারমাণবিক সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক কার্যকারিতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং নিয়ন্ত্রক সক্ষমতার মতো বিষয়গুলোও বিস্তারিতভাবে মূল্যায়ন করতে হবে।
‘এসএমআর নিয়ে আগ্রহী বাংলাদেশ’
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম জানিয়েছেন, বাংলাদেশ এসএমআর প্রযুক্তি নিয়ে প্রাথমিকভাবে আগ্রহী এবং কয়েকটি দেশের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করছে।
তিনি বলেন, “এসএমআর সম্পর্কে আমাদের আরও জানতে হবে। আমরা এতে আগ্রহী। তবে বিষয়টি আরও ভালোভাবে বোঝার পরই সিদ্ধান্ত নেব।”
তবে মংলায় এসএমআর স্থাপনের নির্দিষ্ট চীনা প্রস্তাবটি তাঁর কাছে এখনো পৌঁছায়নি বলেও জানিয়েছেন তিনি। ফলে মংলা প্রকল্পটি এখনো প্রাথমিক আলোচনার পর্যায়েই রয়েছে।
রূপপুরের পর নতুন পারমাণবিক কর্মসূচির ভাবনা
রাশিয়ার সহায়তায় নির্মাণাধীন ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াটের রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বাইরে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কর্মসূচি সম্প্রসারণের সম্ভাবনা পর্যালোচনা করছে বাংলাদেশ।
এর মধ্যেই গত ২৫ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা নিয়ে একটি সমঝোতা স্মারক সই করেছে। এতে শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক প্রযুক্তির ব্যবহার, পারমাণবিক নিরাপত্তা, সুরক্ষা, সেফগার্ডস ও পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তাররোধের বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে।
এ অবস্থায় চীনের মংলা এসএমআর প্রস্তাব বাংলাদেশের পারমাণবিক বিদ্যুৎ কর্মসূচিকে বড় রিঅ্যাক্টরের পাশাপাশি ছোট ও মডুলার প্রযুক্তির দিকেও নেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
মংলা অর্থনৈতিক অঞ্চলের নতুন অধ্যায়
মংলায় এসএমআর প্রস্তাবের সঙ্গে ওই এলাকায় পরিকল্পিত অর্থনৈতিক অঞ্চলের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণভাবে যুক্ত।
২০১৫ সালে মংলা বন্দরের কাছে ১১০ একর জমিতে ভারতীয় ঋণসুবিধার আওতায় একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার জন্য বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সমঝোতা হয়েছিল। পরে নির্ধারিত সময়ে ভূমি উন্নয়নকাজ শেষ না হওয়ায় ওই চুক্তি বাতিল করা হয়।
পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের সময় ঢাকা ও বেইজিং একই এলাকায় চীন-বাংলাদেশ মংলা বন্দর অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা নেয়। ২৫ জুন বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) এবং চায়না সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন করপোরেশনের মধ্যে এ বিষয়ে সমঝোতা স্মারক সই হয়।
ফলে অর্থনৈতিক অঞ্চলটির শিল্প ও অবকাঠামোগত বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণের সঙ্গে এসএমআর প্রস্তাবটি যুক্ত হলে মংলা ভবিষ্যতে বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও জ্বালানি কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।
তবে এসএমআর প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য এখনো সম্ভাব্যতা যাচাই, প্রযুক্তি নির্বাচন, অর্থায়ন, নিরাপত্তা মূল্যায়ন, পরিবেশগত বিষয় এবং নিয়ন্ত্রক অনুমোদনসহ একাধিক ধাপ পেরোতে হবে।
চীনের এই প্রস্তাব তাই আপাতত বাংলাদেশের পারমাণবিক বিদ্যুৎ কর্মসূচির সম্ভাব্য নতুন একটি অধ্যায়—চূড়ান্ত প্রকল্প নয়।




















