বিশ্ববাজারে ডেস্কটপ, ল্যাপটপ ও ওয়ার্কস্টেশন মিলিয়ে কম্পিউটার সরবরাহ ২১.২ শতাংশ কমেছে। মেমোরি ও স্টোরেজের উচ্চমূল্য এবং ভোক্তাদের চাহিদা হ্রাসের কারণে এই পতন ঘটেছে বলে জানিয়েছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান ওমডিয়া।
বিশ্ববাজারে কম্পিউটার সরবরাহ ও বিক্রিতে বড় ধরনের ধস নেমেছে। চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) ডেস্কটপ, ল্যাপটপ ও ওয়ার্কস্টেশন মিলিয়ে কম্পিউটার বিক্রি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২১ দশমিক ২ শতাংশ কমেছে। এই সময়ে বিশ্বজুড়ে মোট ৫ কোটি ৮১ লাখ ইউনিট কম্পিউটার সরবরাহ হয়েছে। টানা দুই প্রান্তিক বাজার ঊর্ধ্বমুখী থাকার পর এমন নিম্নমুখী প্রবণতা প্রযুক্তি বিশ্বে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
প্রযুক্তিবাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান ওমডিয়ার সর্বশেষ প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকের পর এটিই কম্পিউটার সরবরাহের সর্বনিম্ন হার। বাজার বিশ্লেষকরা মনে করছেন, কম্পিউটারের মেমোরি ও স্টোরেজের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ায় ভোক্তাদের মধ্যে কম্পিউটার কেনার আগ্রহ কমেছে।
ওমডিয়ার গবেষণা পরিচালক ইশান দত্তের মতে, ডিভাইসের দাম আরও বাড়তে পারে, এমন আশঙ্কায় বছরের প্রথমার্ধে অনেক ভোক্তা ও প্রতিষ্ঠান আগাম কেনাকাটা সেরে ফেলেছিলেন। সেই সময় বাজারে চাহিদা বেশ শক্তিশালী থাকলেও তৃতীয় প্রান্তিকে এসে তার প্রভাব কমে যায়। ফলে বিক্রিতে এই বড় পতন অপ্রত্যাশিত নয়। বড় কম্পিউটার নির্মাতারাও বছরের দ্বিতীয়ার্ধে সরবরাহ কমার পূর্বাভাস আগে থেকেই দিয়ে রেখেছিলেন।
বাজার সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, কম্পিউটার তৈরির উপকরণের ব্যয় ৪০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। বিশেষ করে ডিআরএএম মেমোরি এবং সলিড-স্টেট ড্রাইভের (এসএসডি) দাম বাড়ায় নির্মাতাদের উৎপাদন খরচ বহুগুণ বেড়েছে। সাধারণত একটি কম্পিউটারের মোট ব্যয়ের প্রায় ১৫ শতাংশজুড়ে থাকে মেমোরি ও স্টোরেজের খরচ, কিন্তু সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে তা ৪০ শতাংশে পৌঁছেছে।
ওমডিয়ার প্রধান বিশ্লেষক বেন ইয়ে জানান, গত কয়েক প্রান্তিকে নির্মাতারা কয়েক দফায় পণ্যের দাম বাড়ালেও যন্ত্রাংশের বাড়তি ব্যয়ের পুরো চাপ সামাল দেওয়া সম্ভব হয়নি। মুনাফা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ায় নির্মাতারা বিপাকে পড়েছেন। অন্যদিকে, খুচরা বাজারে দাম বেড়ে যাওয়ায় ক্রেতারা কম্পিউটার কেনার সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিচ্ছেন বা কেনাকাটা কমিয়ে দিচ্ছেন।
বিশ্ববাজারে সরবরাহ কমলেও শীর্ষ পাঁচ কম্পিউটার নির্মাতার অবস্থানে বড় কোনো পরিবর্তন আসেনি। ওমডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ১ কোটি ৪৯ লাখ ইউনিট কম্পিউটার বিক্রি করে ২৬ শতাংশ বাজার হিস্যা নিয়ে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে লেনোভো। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা এইচপি ১ কোটি ৩ লাখ ইউনিট কম্পিউটার বিক্রি করেছে, তবে শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে তাদের বিক্রিই সবচেয়ে বেশি, ৩১ শতাংশ, কমেছে।
ডেল ৭৬ লাখ ইউনিট কম্পিউটার সরবরাহ করে ১৩ শতাংশ বাজার হিস্যা দখল করে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে। চতুর্থ অবস্থানে থাকা অ্যাপল ৬৮ লাখ ইউনিট কম্পিউটার সরবরাহ করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ১১ শতাংশ কম। তবে সরবরাহ কমলেও বাজারে অ্যাপলের হিস্যা ১ শতাংশীয় পয়েন্টের বেশি বেড়েছে, কারণ তুলনামূলক বেশি দামের পণ্যের বাজারে তাদের অবস্থান এখনও শক্তিশালী।
ওমডিয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী, কম্পিউটারের বাজারে এই চাপ চলতি বছরের শেষ প্রান্তিকে আরও বাড়তে পারে। ২০২৬ সালের চতুর্থ প্রান্তিকে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) বিশ্ববাজারে কম্পিউটার সরবরাহ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৪ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। এই পতন অব্যাহত থাকলে আগামী বছরও বাজার সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি নির্মাতা, যন্ত্রাংশ সরবরাহকারী ও পরিবেশকদের ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করবে। বিশেষ করে যারা তুলনামূলক কম দামে কম্পিউটার বিক্রি করে, তাদের জন্য পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। যন্ত্রাংশের ব্যয় বৃদ্ধি পণ্যের দামে প্রতিফলিত হলে দামের বিষয়ে সতর্ক ক্রেতারা কেনাকাটা আরও কমিয়ে দিতে পারেন, যা পুরো প্রযুক্তি শিল্পের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।





















