রাজধানীর যমুনা ফিউচার পার্কের ‘অ্যাপল হট’ থেকে কেনা আইফোন ১৬ প্রো ম্যাক্স চোরাই দাবি করে নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ফোনটির ক্রেতা ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী আয়ানের অভিযোগ, ফোনটি নিয়ে যাওয়ার সময় তাঁর কাছ থেকে ১৭ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে। তবে অভিযুক্ত উপপরিদর্শক (এসআই) মেহেদী হাসান টিটু এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
ঘটনাটি ঘিরে এখন প্রশ্ন উঠেছে, যমুনা ফিউচার পার্কের মতো বড় বাণিজ্যিক কেন্দ্রে ব্যবহৃত আইফোন কেনাবেচার ক্ষেত্রে পণ্যের মালিকানা ও উৎস কতটা যাচাই করা হয়। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে ফোন বিক্রির প্রক্রিয়া ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা নিয়েও তদন্ত প্রয়োজন হবে।
১ লাখ ৫ হাজার টাকায় কেনা ফোন নিয়ে বিপাকে শিক্ষার্থী
আয়ানের দাবি, গত ২৬ সেপ্টেম্বর যমুনা ফিউচার পার্কের ‘অ্যাপল হট’ থেকে ১ লাখ ৫ হাজার টাকা দিয়ে আইফোন ১৬ প্রো ম্যাক্সটি কেনেন তিনি। গত ১০ অক্টোবর বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে এসআই মেহেদী হাসান তাঁর বাসায় গিয়ে ফোনটি চোরাই বলে দাবি করেন। পরে ফোনটি নিয়ে যাওয়া হয়।
আয়ানের ভাষ্য, ফোন কেনার নগদ মেমো ও বাক্স দেখানোর পরও পুলিশ কর্মকর্তা ফোনটি নিয়ে যান। এ সময় ফোনের অবস্থান শনাক্ত করার খরচের কথা বলে তাঁর কাছ থেকে ১৭ হাজার টাকা নেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি। ফোন নিয়ে যাওয়ার সময় ভিডিও ধারণ করা হলেও সেটি তাঁকে দেওয়া হয়নি বলে দাবি তাঁর।
জোরারগঞ্জ থানার জিডি নম্বর ৬৮৩
প্রাপ্ত জিডির কপিতে দেখা যায়, চট্টগ্রামের জোরারগঞ্জ থানায় চুরির ঘটনায় একটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে। নথিতে জিডি নম্বর **৬৮৩**, তারিখ **১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬** এবং জিডি ট্র্যাকিং নম্বর **651EAQ** উল্লেখ রয়েছে।

জিডিতে অভিযোগকারী শারমিনা আক্তার রিমি তাঁর বাসা থেকে নগদ টাকা, স্বর্ণালংকার ও একটি আইফোন ১৬ প্রো ম্যাক্স চুরির অভিযোগ করেন। নথিতে নগদ ৫০ হাজার টাকা, প্রায় ১ ভরি ৮ আনা স্বর্ণালংকার এবং আইফোনটির মূল্য প্রায় ২ লাখ ২২ হাজার টাকা উল্লেখ রয়েছে। অভিযোগপত্র অনুযায়ী, সব মিলিয়ে ক্ষতির পরিমাণ ৬ লাখ ৫২ হাজার টাকা।
অভিযোগের ভিত্তিতে ফোনটি উদ্ধার করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন এসআই মেহেদী হাসান টিটু। তবে জিডিতে উল্লেখ করা ফোনটি এবং আয়ানের কাছ থেকে নিয়ে যাওয়া ফোনটি একই কি না, তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট আইএমইআই নম্বর, জব্দতালিকা ও তদন্তের নথি মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।
এসআইয়ের দাবি, অভিযোগ মিথ্যা
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে এসআই মেহেদী হাসান টিটু দাবি করেন, জোরারগঞ্জ থানার জিডি ও সংশ্লিষ্ট রিকুইজিশনের ভিত্তিতে গত ১০ অক্টোবর আইফোন ১৬ প্রো ম্যাক্সটি বাক্সসহ উদ্ধার করেন তিনি। এ-সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় কাগজপত্রও তাঁর কাছে রয়েছে বলে জানান তিনি।
১৭ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগকে মিথ্যা ও বানোয়াট দাবি করে এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ফোনটি প্রকৃত মালিকের কাছে হস্তান্তরের উদ্যোগ নেওয়ার পর বিভিন্ন ব্যক্তি তাঁকে ফোন করে চাপ দেন। ফোনটি যেন অভিযোগকারীর কাছে হস্তান্তর করা না হয়, সে জন্যও বিভিন্নভাবে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
এসআই মেহেদী হাসান আরও অভিযোগ করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন সংবাদমাধ্যমে যাচাই-বাছাই ছাড়াই একপক্ষের বক্তব্যের ভিত্তিতে সংবাদ প্রকাশ করে তাঁকে ও তাঁর বাহিনীকে হেয়প্রতিপন্ন করা হচ্ছে।
বড় শপিং মলগুলোতে ব্যবহৃত ফোনের উৎস যাচাই হয় কি?
‘অ্যাপল হট’র বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন বড় শপিং মল ও মোবাইল ফোন বিক্রির দোকানে ব্যবহৃত ফোনের উৎস যাচাইয়ের বিষয়টিও সামনে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন জায়গায় পুরোনো বা ব্যবহৃত ফোন কেনাবেচার ক্ষেত্রে আগের মালিকানা ও ফোনের বৈধ উৎস যথাযথভাবে যাচাই করা হয় কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
তবে দেশের বিভিন্ন শপিং মলে চোরাই ফোন বিক্রি হয়ে থাকে—এমন দাবির পক্ষে এই মুহূর্তে স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো পরিসংখ্যান বা প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে বিষয়টিকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন না করে, বিক্রেতাদের যাচাইপ্রক্রিয়া খতিয়ে দেখার দাবি হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
এ ঘটনায় ‘অ্যাপল হট’ ফোনটি কার কাছ থেকে সংগ্রহ করেছিল, কেনার সময় আগের মালিকের পরিচয় ও আইএমইআই যাচাই করা হয়েছিল কি না এবং বিক্রির রেকর্ডে ফোনটির উৎসের তথ্য রয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে দোকান কর্তৃপক্ষের বক্তব্য নেওয়া এবং সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই করা প্রয়োজন।
তদন্তে যেসব বিষয় পরিষ্কার হওয়া জরুরি
এ ঘটনায় তিনটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, জোরারগঞ্জ থানার জিডিতে উল্লেখ করা আইফোনের আইএমইআই এবং আয়ানের কাছ থেকে নেওয়া ফোনটির আইএমইআই একই কি না। দ্বিতীয়ত, ফোনটি উদ্ধার করার সময় ১৭ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগের পক্ষে কোনো লেনদেনের নথি, ভিডিও বা প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য রয়েছে কি না। তৃতীয়ত, ফোনটির সরবরাহ ও বিক্রির সঙ্গে ‘অ্যাপল হট’র ভূমিকা কী ছিল।
ফোনটি প্রকৃত মালিকের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি বৈধভাবে কেনা ফোনের ক্রেতার স্বার্থ রক্ষাও গুরুত্বপূর্ণ। তাই অভিযোগের সত্যতা যাচাই, ফোন জব্দের আইনগত প্রক্রিয়া পর্যালোচনা এবং বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা অনুসন্ধানের মাধ্যমে ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।


















