সারাক্ষণ ফোনে নোটিফিকেশনের শব্দ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্ক্রল আর মেসেজের উত্তর দিতে দিতে কখন যে দিনের বড় একটি অংশ চলে যায়, তা অনেকেই বুঝতে পারেন না। কাজের ফাঁকে একবার ফোন হাতে নেওয়ার পর প্রয়োজনের চেয়ে বেশি সময় কেটে যায়। এতে ব্যাহত হয় কাজের মনোযোগ, কমে যায় নিজের জন্য বরাদ্দ সময়। এমন পরিস্থিতিতে স্মার্টফোনের ব্যবহার কমিয়ে সাধারণ ফিচার ফোনে ফিরে যাওয়ার কথা ভাবছেন অনেকে।
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের শিল্পী অগাস্ট ল্যাম মনে করেন, স্মার্টফোনের ওপর নির্ভরতা কমাতে পারলে দৈনন্দিন জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহার কমানোর পক্ষে কাজ করা এই শিল্পী ২০২২ সালে প্রায় ২৭ বছর বয়সে স্মার্টফোন ব্যবহার ছেড়ে দেন।
নিজের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তিনি লিখেছেন ‘ইউ ডোন্ট নিড আ স্মার্টফোন: আ প্র্যাকটিক্যাল গাইড টু ডাউনগ্রেডিং ইয়োর ফোন অ্যান্ড আপগ্রেডিং ইয়োর লাইফ’ বইটি। এতে স্মার্টফোনের ব্যবহার কমানোর কারণ, সম্ভাব্য উপকারিতা এবং নতুন জীবনযাপনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার বিভিন্ন উপায় তুলে ধরেছেন তিনি। সম্প্রতি সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারেও স্মার্টফোন ছাড়ার পর নিজের জীবনে আসা পরিবর্তন নিয়ে কথা বলেছেন ল্যাম।
তাঁর অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, স্মার্টফোনের ব্যবহার কমালে সম্পর্ক, মানসিক প্রশান্তি, সময় ব্যবস্থাপনা, স্মৃতিশক্তি এবং বর্তমান মুহূর্তে মনোযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে পরিবর্তন আসতে পারে।
১. অন্যদের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর হতে পারে
স্মার্টফোন ছেড়ে দেওয়ার আগে ল্যামের আশঙ্কা ছিল, পরিচিতদের সঙ্গে যোগাযোগ কমে যাবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন আয়োজনের খবর জানতে না পারায় নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগও কমতে পারে বলে মনে করেছিলেন তিনি।
কিন্তু তাঁর অভিজ্ঞতা হয়েছে উল্টো। নতুন বন্ধুত্ব তৈরি হয়েছে, পুরোনো সম্পর্কও আরও দৃঢ় হয়েছে।
ল্যামের মতে, কারও সঙ্গে সময় কাটানোর সময় ফোনের দিকে মনোযোগ না দিলে সেই মানুষটির প্রতি পুরোপুরি মনোযোগ দেওয়া যায়। একইভাবে একা থাকার সময়ও ফোনে ডুবে না থেকে নিজের মতো করে সময় কাটানো সম্ভব হয়।
স্মার্টফোন ব্যবহারের কারণে অনেক সময় একই জায়গায় বসে থেকেও মানুষ পরস্পরের কাছ থেকে মানসিকভাবে দূরে থাকে। আবার একা থাকার সময়ও ফোনের মাধ্যমে অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগে ব্যস্ত থাকে। এতে ব্যক্তিগত সময় ও সামাজিক সম্পর্কের স্বাভাবিক ভারসাম্য বিঘ্নিত হতে পারে।
ফোন ব্যবহারের অভ্যাস বদলানোর পর ল্যামের বন্ধুত্বের ধরনেও পরিবর্তন এসেছে। বন্ধুরা কোথাও বেড়াতে গেলে কিংবা জীবনে নতুন কিছু ঘটলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দেওয়ার বদলে তাঁকে সরাসরি ফোন করে বা কথা বলে খবর জানাতে হয়। এতে নির্দিষ্ট মানুষের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
নতুন কারও সঙ্গে পরিচয়ের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যুক্ত হওয়ার পরিবর্তে সরাসরি আবার দেখা করার পরিকল্পনা করেন তিনি। ফলে ভবিষ্যতে যোগাযোগ করার কথা বলে থেমে থাকার বদলে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ বাড়ে।
২. মন খারাপ হলেই ফোন হাতে নেওয়ার প্রবণতা কমে
মন খারাপ, দুশ্চিন্তা কিংবা অস্বস্তি অনুভব করলে অনেকেই ফোন হাতে তুলে নেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘোরাঘুরি, ভিডিও দেখা কিংবা বিভিন্ন পোস্ট পড়ার মাধ্যমে সাময়িকভাবে মন অন্যদিকে সরিয়ে রাখার চেষ্টা করেন।
ল্যামের ভাষ্য অনুযায়ী, স্মার্টফোন ছেড়ে দেওয়ার শুরুর দিকে নিজেকে খাঁচায় আটকে পড়ার মতো মনে হতে পারে। কারণ, এত দিন যেসব অনুভূতি থেকে মন সরিয়ে রাখতে ফোন ব্যবহার করা হতো, সেগুলোর মুখোমুখি হতে হয় নতুন করে।
তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিকল্প অভ্যাস গড়ে তোলা সম্ভব। ল্যাম মানসিক চাপ অনুভব করলে বন্ধুর সঙ্গে কথা বলা, বই পড়া, হাঁটতে বের হওয়া কিংবা গান শোনার মতো কাজে মনোযোগ দেন।
এভাবে অস্বস্তি এড়িয়ে যাওয়ার জন্য ফোনের ওপর নির্ভর না করে অন্য উপায়ে নিজেকে সামলানোর অভ্যাস তৈরি হতে পারে। নিজের অনুভূতিকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করার সুযোগও বাড়ে।
তবে স্মার্টফোন কম ব্যবহার করলেই যে সবার মানসিক চাপ বা মন খারাপ কমে যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। ব্যক্তিভেদে অভিজ্ঞতা ভিন্ন হতে পারে।
৩. নিজের জন্য বাড়তি সময় পাওয়া যায়
স্মার্টফোনে অনলাইনে বিল পরিশোধ, পথ খুঁজে নেওয়া, টিকিট কেনা কিংবা প্রয়োজনীয় তথ্য অনুসন্ধান করা সহজ। ফলে ফোন ছাড়া দৈনন্দিন জীবন অনেকের কাছে ঝামেলার মনে হতে পারে।
কিন্তু ফোনে ব্যয় করা সময় হিসাব করলে ভিন্ন চিত্র দেখা যেতে পারে। বিশেষ করে দিনের বিভিন্ন সময়ে অল্প অল্প করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দেখা, নোটিফিকেশন পরীক্ষা করা এবং মেসেজের উত্তর দিতে গিয়ে মোট কতটা সময় চলে যায়, তা অনেকেই হিসাব করেন না।
ল্যামের মতে, ফোনের পেছনে ব্যয় করা সময় কমলে নিজের কাজ, শখ কিংবা বিশ্রামের জন্য বাড়তি সময় পাওয়া সম্ভব।
কিছু কাজের জন্য সরাসরি বাইরে যেতে হতে পারে, টিকিট ছাপিয়ে নিতে হতে পারে কিংবা কাউকে ফোন করে তথ্য জানতে হতে পারে। এসব কাজে সময় লাগলেও হাঁটাচলা ও মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হয়।
ফোনের প্রতি আকর্ষণ কমলে ব্যস্ত দিনের মধ্যেও নিজের জন্য সময় বের করা সহজ হতে পারে। কাজের ফাঁকে বারবার নোটিফিকেশন দেখার প্রবণতা কমলে মনোযোগ ধরে রাখতেও সুবিধা হতে পারে।
৪. স্মৃতিশক্তি ও পথ চেনার দক্ষতা ব্যবহারের সুযোগ বাড়ে
কোথাও যাওয়ার আগে গুগল ম্যাপ খুলে পথ দেখে নেওয়া কিংবা কোনো তথ্য মনে রাখার পরিবর্তে ফোনে খুঁজে নেওয়া এখন অনেকের অভ্যাস। এতে প্রয়োজনীয় তথ্য দ্রুত পাওয়া গেলেও দৈনন্দিন কাজে নিজের স্মৃতি ও স্থান চেনার দক্ষতা ব্যবহার করার সুযোগ কমে যেতে পারে।
ল্যামের অভিজ্ঞতায়, স্মার্টফোন ছেড়ে দেওয়ার পর নিজের মনে রাখার ক্ষমতা এবং পথ চিনে চলার দক্ষতার ওপর তাঁর আস্থা বেড়েছে।
ফোনের ওপর নির্ভরতা কমলে কোনো জায়গায় যাওয়ার আগে পথ সম্পর্কে ধারণা নেওয়া, গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মনে রাখা এবং আশপাশের পরিবেশ খেয়াল করার অভ্যাস গড়ে তোলা যায়।
তবে স্মার্টফোন ব্যবহার কমালেই স্মৃতিশক্তি নিশ্চিতভাবে বেড়ে যায়—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো তথ্য এখানে নেই। বরং ফোনের ওপর নির্ভরতা কমলে স্মৃতি ও স্থান চেনার মতো দক্ষতা কাজে লাগানোর সুযোগ বাড়তে পারে।
৫. বর্তমান মুহূর্তে মনোযোগ দেওয়া সহজ হয়
কারও সঙ্গে কথা বলছেন, অথচ মনে হচ্ছে কখন ফোনটি আবার হাতে নেওয়া যাবে। কোথাও বসে আছেন, কিন্তু নতুন মেসেজ এসেছে কি না, তা দেখার অপেক্ষায় রয়েছেন। এমন অভিজ্ঞতা হলে বুঝতে হবে, ফোন শুধু সময়ই নিচ্ছে না, মনোযোগও ভাগ করে নিচ্ছে।
ল্যাম জানান, স্মার্টফোন ব্যবহারের সময় তাঁরও এমন অভিজ্ঞতা হতো। অন্য কারও সঙ্গে কথা বলতে বলতে ভাবতেন, কখন আবার ফোন দেখবেন। ফলে সামনে থাকা মানুষটির সঙ্গে কথোপকথনে পুরোপুরি মনোযোগ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ত।
তিনি বিষয়টিকে এমন পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা করেছেন, যখন প্রতিবেশী কথা বলতে এসেছেন, অথচ চুলায় রান্না বসানো রয়েছে। কথোপকথনে মন দিতে চাইলেও রান্নার চিন্তা বারবার মনোযোগ সরিয়ে নেয়।
ল্যামের মতে, মনোযোগ বারবার অন্যদিকে চলে গেলে বর্তমান মুহূর্ত উপভোগ করা কঠিন হয়। ফোনের প্রতি টান কমলে কথোপকথন, ব্যক্তিগত সময় কিংবা আশপাশের পরিবেশে মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ বাড়তে পারে।
এক মাস স্মার্টফোন ছাড়া থাকার চেষ্টা করবেন?
স্মার্টফোন ছাড়া জীবন কেমন হবে, তা নিয়ে অনেকের সংশয় রয়েছে। প্রয়োজনীয় কাজ আটকে যাওয়া, যোগাযোগে সমস্যা কিংবা দৈনন্দিন জীবন কঠিন হয়ে পড়ার আশঙ্কাও রয়েছে। বিশেষ করে ব্যাংকিং, টিকিট বুকিং, দিকনির্দেশনা কিংবা চিকিৎসাসংক্রান্ত কাজে বিভিন্ন অ্যাপের প্রয়োজন হতে পারে।
ল্যামের পরামর্শ, চেষ্টা না করেই স্মার্টফোন ছাড়া চলা অসম্ভব বলে ধরে নেওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং এক মাস স্মার্টফোন ব্যবহার না করে অভিজ্ঞতা যাচাই করা যেতে পারে। মাস শেষে নিজের সময়, মনোযোগ ও দৈনন্দিন জীবনে কী পরিবর্তন এসেছে, তা পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব।
যাঁদের চিকিৎসাসংক্রান্ত প্রয়োজনে স্মার্টফোনের অ্যাপ ব্যবহার করতে হয়, তাঁদের ক্ষেত্রে বিকল্প ব্যবস্থা রাখা জরুরি। প্রয়োজনে দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য ফিচার ফোন রেখে চিকিৎসার কাজে স্মার্টফোন ব্যবহার করা যেতে পারে।
সবার জন্য স্মার্টফোন ছেড়ে দেওয়া প্রয়োজন নয়। তবে নোটিফিকেশন, বারবার স্ক্রল করা কিংবা অনলাইনে দীর্ঘ সময় কাটানোর কারণে কাজের মনোযোগ ও ব্যক্তিগত সময় ব্যাহত হলে ফোন ব্যবহারের অভ্যাসে পরিবর্তন আনা যেতে পারে।
দিনের নির্দিষ্ট সময়ে নোটিফিকেশন বন্ধ রাখা, অপ্রয়োজনীয় অ্যাপের ব্যবহার সীমিত করা এবং খাওয়ার সময় বা বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় ফোন দূরে রাখার মতো ছোট পদক্ষেপ দিয়েও শুরু করা সম্ভব। লক্ষ্য স্মার্টফোন পুরোপুরি বাদ দেওয়া নয়; বরং প্রযুক্তিকে প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করে নিজের সময় ও মনোযোগের ওপর নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনা।


















