দেশের বাজারে স্মার্টফোন কেনার ক্ষেত্রে ক্রেতাদের একটি বড় অংশের আগ্রহ আনঅফিশিয়াল বা অননুমোদিত পথে আমদানি করা ফোনের দিকে। তুলনামূলক কম দাম, আকর্ষণীয় ফিচার এবং একই মডেলের অফিসিয়াল সংস্করণের চেয়ে কয়েক হাজার টাকা সাশ্রয়ের সুযোগ ক্রেতাদের এ ধরনের ফোনের প্রতি আকৃষ্ট করছে। তবে কম দামে ফোন কেনার এই সিদ্ধান্তই অনেক সময় ক্রেতার জন্য বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করছে। ওয়ারেন্টি না পাওয়া, বিক্রয়-পরবর্তী সেবার অনিশ্চয়তা, নকল বা পুনরায় প্যাকেটজাত ফোন এবং আইএমইআই-সংক্রান্ত জটিলতায় প্রতারিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষ করে অনলাইনে এবং বিভিন্ন অননুমোদিত বিক্রয়কেন্দ্রে ফোন কেনার সময় ক্রেতারা সব তথ্য যাচাই না করেই সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। ফলে নতুন ফোন কেনার পর সেটি আগে থেকেই সক্রিয় ছিল কি না, ব্যবহৃত বা সংস্কার করা (রিফারবিশড) কি না, কিংবা ঘোষিত মডেলের সঙ্গে সরবরাহ করা ফোনের মিল রয়েছে কি না—এসব বিষয় নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
দামের পার্থক্যই কি প্রধান আকর্ষণ?
আনঅফিশিয়াল ফোনের বাজারে জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ দাম। একই মডেলের অফিসিয়াল ও আনঅফিশিয়াল সংস্করণের মধ্যে কয়েক হাজার থেকে কখনো আরও বেশি টাকার পার্থক্য দেখা যায়। আমদানি, কর, শুল্ক, পরিবেশক ও বিপণন ব্যয়ের পার্থক্যের কারণে এ মূল্য ব্যবধান তৈরি হতে পারে।
তবে কম দামের পেছনে ফোনটির উৎস, আমদানির বৈধতা, বিক্রেতার দায়বদ্ধতা এবং বিক্রয়-পরবর্তী সেবার বিষয়গুলোও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। শুধু দাম দেখে ফোন কিনলে পরবর্তী সময়ে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন ক্রেতা।
নতুন ফোনের নামে পুরোনো বা আগে সক্রিয় করা সেট?
আনঅফিশিয়াল ফোন কেনার ক্ষেত্রে অন্যতম ঝুঁকি হলো নতুন বলে ব্যবহৃত বা আগে সক্রিয় করা ফোন বিক্রির অভিযোগ। কোনো ফোনের বক্স ও সিল দেখতে অক্ষত হলেই সেটি অব্যবহৃত—এমন নিশ্চয়তা পাওয়া যায় না।
কিছু ক্ষেত্রে ফোনের অ্যাক্টিভেশন বা ওয়ারেন্টির সময়সীমা আগেই শুরু হয়ে থাকতে পারে। আবার ব্যবহৃত ফোন নতুন করে প্যাকেটজাত করে বিক্রির অভিযোগও রয়েছে। তাই ফোন কেনার আগে আইএমইআই নম্বর, অ্যাক্টিভেশন-সংক্রান্ত তথ্য এবং প্রস্তুতকারকের সমর্থিত যাচাইব্যবস্থা থাকলে সেটির মাধ্যমে তথ্য পরীক্ষা করা উচিত।
আইএমইআই যাচাই না করেই ফোন কিনছেন?
প্রতিটি মোবাইল ফোনের জন্য নির্দিষ্ট পরিচিতি নম্বর হলো আইএমইআই (IMEI)। সাধারণত ফোনে *#06# ডায়াল করে আইএমইআই নম্বর জানা যায়। কেনার আগে ফোনের আইএমইআই নম্বর, বক্সে থাকা নম্বর এবং ক্রয় রসিদে উল্লেখ করা নম্বর মিলিয়ে দেখা জরুরি।
বাংলাদেশে মোবাইল ফোনের বৈধতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে বিটিআরসির ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (এনইআইআর) গুরুত্বপূর্ণ। এ ব্যবস্থার মাধ্যমে মোবাইল হ্যান্ডসেটের আইএমইআই ও নিবন্ধন-সংক্রান্ত তথ্য যাচাই করা যায়। তবে শুধু আইএমইআই নম্বর থাকলেই ফোনটি সম্পূর্ণ ঝুঁকিমুক্ত বা সব দিক থেকে বৈধ—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। কেনার আগে বিটিআরসির নির্ধারিত পদ্ধতিতে হ্যান্ডসেটের অবস্থা যাচাই করা উচিত।
ওয়ারেন্টি ও সার্ভিস নিয়ে বিপাকে ক্রেতা
অফিশিয়াল ফোনের ক্ষেত্রে সাধারণত সংশ্লিষ্ট ব্র্যান্ড বা অনুমোদিত পরিবেশকের নির্ধারিত ওয়ারেন্টি ও বিক্রয়-পরবর্তী সেবা পাওয়ার সুযোগ থাকে। কিন্তু আনঅফিশিয়াল ফোনে এ সুবিধা সব ক্ষেত্রে নিশ্চিত নয়। কোনো বিক্রেতা নিজস্ব ওয়ারেন্টি দিলেও সেটি প্রস্তুতকারকের আনুষ্ঠানিক ওয়ারেন্টির সমান নয়।
ফোনে ডিসপ্লে, ব্যাটারি, মাদারবোর্ড কিংবা অন্য কোনো যন্ত্রাংশে সমস্যা দেখা দিলে অনুমোদিত সার্ভিস সেন্টারে বিনা খরচে মেরামতের সুযোগ নাও মিলতে পারে। আবার প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ না পাওয়া গেলে মেরামতের খরচ ও সময়—দুটিই বেড়ে যেতে পারে।
কেনার আগে যেসব বিষয় যাচাই করবেন
আনঅফিশিয়াল ফোন কেনার সিদ্ধান্ত নিলে কয়েকটি বিষয় অবশ্যই যাচাই করা উচিত।
১. ফোনের আইএমইআই নম্বর, বক্স ও রসিদের তথ্য মিলিয়ে নিন।
২. বিটিআরসির নির্ধারিত পদ্ধতিতে ফোনের নিবন্ধন ও বৈধতার অবস্থা যাচাই করুন।
৩. ফোন আগে সক্রিয় করা হয়েছে কি না, তা প্রস্তুতকারকের সমর্থিত ব্যবস্থায় পরীক্ষা করুন।
৪. বিক্রেতার কাছ থেকে লিখিত ওয়ারেন্টি, ফেরত ও পরিবর্তনের শর্ত জেনে নিন।
৫. ফোনের মডেল, র্যাম, স্টোরেজ, প্রসেসর ও আঞ্চলিক সংস্করণ মিলিয়ে দেখুন।
৬. ফোনের বক্স, চার্জার ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক উপকরণ যাচাই করুন।
৭. ক্যাশ মেমো বা চালানে ফোনের মডেল, আইএমইআই, মূল্য ও বিক্রেতার পরিচয় উল্লেখ আছে কি না নিশ্চিত করুন।
সাশ্রয় করতে গিয়ে বড় ক্ষতি নয়
আনঅফিশিয়াল ফোন কেনা মানেই প্রতারিত হওয়া নয়। তবে এ ধরনের ফোন কেনার ক্ষেত্রে ক্রেতাকে তুলনামূলক বেশি সতর্ক থাকতে হয়। কম দামের সুবিধার পাশাপাশি সম্ভাব্য ঝুঁকি, ওয়ারেন্টি, মেরামত ব্যয় এবং ফোনের বৈধতার বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
স্মার্টফোন কেনার আগে শুধু দাম বা ফিচার নয়, বিক্রেতার বিশ্বাসযোগ্যতা এবং ফোনটির উৎস সম্পর্কেও নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। কয়েক হাজার টাকা সাশ্রয়ের আশায় এমন কোনো ফোন কেনা উচিত নয়, যেটি ব্যবহারের পর আইনি, প্রযুক্তিগত কিংবা আর্থিক জটিলতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।



















