দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী প্রাণ-আরএফএল। শিল্পপ্রতিষ্ঠানটি জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ছায়া দরপত্র নেটওয়ার্ক পরিচালনা করছে। প্রতিষ্ঠানটি ব্যবহার করেছে নকল করপোরেট পরিচয়, সাংঘর্ষিক কর নথি এবং এমন সংস্থার দরপত্র প্রস্তাব যার কোনো অস্তিত্বই নেই সরকারি নথিপত্রে। আর এসব ভ্যাট ফাঁকি দেওয়ার উদ্দেশ্যে সুকৌশলে এ কাজটি করেছে তারা।
একটি গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বৃহৎ শিল্প গ্রুপটি অস্বিস্তহীন কোম্পানি বানিয়ে ঠিকাদারির কাজ নিয়ে কোটি কোটি টাকা ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছেন।
চলতি বছরের জুনে গণপূর্ত অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা দরপত্র সংক্রান্ত নথি পর্যালোচনা করতে গিয়ে বড় ধরনের অনিয়মের সন্ধান পেয়েছেন প্রাণ-আরএফএলের বিরুদ্ধে। তিনি নথিতে দেখেছেন, দুটি দরদাতার একই নাম, একই পরিচালক, একই মালিকানা প্রতিষ্ঠান এমনকি ঢাকার একই ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছে। একটি ছিল বৈধ, অন্যটি ছিল শুধু সরকারের ই-জিপি ক্রয় প্ল্যাটফর্মের ভেতরে। আর এই দুই প্রতিষ্ঠানই প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের। একটি শব্দের দুটি বানান ‘লিমিটেড’ ও ‘এলটিডি’ ব্যবহার করে বহু বছর ধরে গড়ে তুলেছে একটি সুপরিকল্পিত দুর্নীতির জাল।
একটি গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দেশের বৃহত্তম শিল্পগোষ্ঠীটি নিজেদের সঙ্গেই প্রতিযোগিতা করে স্বাভাবিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এড়িয়েছে এবং ২০১৫ থেকে ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত ৫৯৬টি কাজ পেয়েছে। টাকার অংকে যেগুলোর মোট মূল্য ২ হাজার ৩৮৪ কোটি।
প্রাণ-আরএফএল দেশের অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখা শিল্পগোষ্ঠী। খাদ্যপ্রক্রিয়াজাতকরণ, প্লাস্টিক, হালকা প্রকৌশল, ইলেকট্রনিকস ও রপ্তানি খাতে বড় অবদান রয়েছে তাদের। লক্ষাধিক কর্মসংস্থান, বার্ষিক টার্নওভার প্রায় ৩৬ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু এমন চিত্রের আড়ালে রয়েছে বড় ধরনের জালিয়াতির গল্পও।
ই-জিপির তথ্য, যৌক্ত মূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তর (আরজেএসসি) ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নথিপত্র থেকে বোঝা যায়, এটি ছিল সুপরিকল্পিত পদ্ধতিগত জালিয়াতি।
রংপুর মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড (Rangpur Metal Industries Limited) কোম্পানিটি যা ই-জিপিতে অত্যন্ত সক্রিয়। কিন্তু বাস্তবে এই কোম্পানির কোথাও অস্বিস্ত নেই। অস্বিস্তহীন এই কোম্পানিটি প্রাণ-আরএফএলের। ‘রংপুর মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড’ নামের এই সত্তা ২০১৬ সাল থেকে ৩০৫ দশমিক ৩ কোটি টাকার সরকারি কাজ পেয়েছে।
আরজেএসসি রেকর্ড বলছে, এমন কোনো কোম্পানির অস্তিত্ব বাংলাদেশে নেই। যেটি আছে, সেটি হলো রংপুর মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ এলটিডি. (Rangpur Metal Industries Ltd.)। যেটি প্রাণ-আরএফএলের নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান।
কাগজপত্রে ‘লিমিটেড’ ও ‘এলটিডি.’-এর পার্থক্য। আপাপতদৃষ্টিতে এই পার্থক্য নগন্য মনে হলেও প্রাণ-আরএফএল ব্যবসায়িক কার্যক্রমে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করে কারসাজির আশ্রয় নিয়েছে।
ই-জিপিতে থাকা ভুয়া ‘রংপুর মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড’ কোম্পানির আলাদা সরবরাহকারী প্রোফাইল, আলাদা দরপত্র ইতিহাস, আলাদা কাজের তালিকা রয়েছে। তবে কোম্পানিটির কোনো নিবন্ধন নেই, অনুমোদিত স্বাক্ষরকারী নেই, এমনকি নামের সঙ্গে খাপ খায় এমন কোনো কর পরিচয়ও নেই।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এই ভুয়া কোম্পানির দরপত্রে ব্যবহৃত বিআইএনটি (ব্যবসায় সনাক্তকরণ নম্বর) প্রকৃত ‘লি.’ প্রতিষ্ঠানের। অর্থাৎ ভুয়া কোম্পানিটি চলেছে মূল প্রতিষ্ঠানের কর পরিচয় ধার করে।
সরকারি দরপত্রে প্রাণ-আরএফএলের উপস্থিতি শুধু দুটি প্রতিষ্ঠানে সীমাবদ্ধ নয়।
‘প্রপার্টি ডেভেলপমেন্ট লিমিটেড’ নামে আরও একটি প্রতিষ্ঠান একইভাবে অংশ নিয়েছে। ফলে তিনটি ভিন্ন সত্তার নামে একই গোষ্ঠী বহু দরপত্রে অংশ নিয়ে এসেছে। তিন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ২০১৫–২০২৫ সময়ে ৫৯৬টি কাজ পেয়েছে তারা।
অনেক দরপত্রেই দেখা গেছে, সর্বনিম্ন দরদাতাদের তালিকায় প্রাণ-আরএফএলের যেকোনো একটি প্রতিষ্ঠানের নাম ছিল। এটি প্রমাণ করে, এই টেন্ডারগুলো শিল্পগোষ্ঠীটির নিয়ন্ত্রণে হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের ভাষায় এক ধরনের ‘কৃত্রিম প্রতিযোগিতা’ সৃষ্টি করে আসছে প্রাণ-আরএফএল। যেখানে বহুমাত্রিক দরদাতার ভান করে নিয়ন্ত্রণ রাখা হচ্ছে এই গোষ্ঠীর হাতেই।
চলতি বছরের ৭ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয় চারটি লিফট স্থাপনের জন্য দুটি দরপত্র আহ্বান করে। দরপত্র জমা দেয় প্রপার্টি ডেভেলপমেন্ট লিমিটেড এবং রংপুর মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। একটি বৈধ, একটি ভুয়া।
দুটিই প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের চেয়ারম্যান আহসান খান চৌধুরীর মালিকানাধীন। দুটি প্রস্তাবেই প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলো ছিল প্রথম ছয়ের মধ্যে; একটি দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতা, অন্যটিতে ষষ্ঠ।
পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন ২০০৬ এবং পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা ২০০৮ অনুযায়ী, একই মালিকানার একাধিক প্রতিষ্ঠান একই দরপত্রে একাধিক প্রস্তাব জমা দিতে পারে না। তবু প্রায় এক দশক ধরে এই অনিয়ম চলে আসছে এবং গত ৭ সেপ্টেম্বরের দরপত্রের ঘটনা প্রমাণ করে যে, ভুয়া কোম্পানিটি সাম্প্রতিক সময়েও সক্রিয়।
সরকারি ক্রয়ে গ্রুপটির একক প্রস্তাবের অস্বাভাবিক আধিক্য রয়েছে যা উন্মুক্ত দরপত্রে সুস্থ প্রতিযোগিতার পরিবেশ নষ্ট করেছে। গ্রুপটির তিন প্রতিষ্ঠানের মোট কাজের এক-তৃতীয়াংশই এসেছে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ছাড়া।
প্রপার্টি ডেভেলপমেন্ট লিমিটেডের গত ১০ বছরে পাওয়া ৩৭৬টি কার্যাদেশের মধ্যে ৫৯ শতাংশই ছিল একক দরপত্র। শুধু ২০২৫ সালেই প্রতিষ্ঠানটি পেয়েছে ৬৩৭ দশমিক ৬ কোটি টাকার কাজ। যা তাদের ১০ বছরের কাজের প্রায় ৯৬ শতাংশ।
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের দুর্নীতি প্রসঙ্গে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘প্রাণ-আরএফএল যেভাবে দরপত্র জিতেছে তা “পরিকল্পিত ডিজাইনের” ইঙ্গিত দেয়। একাধিক প্রতিষ্ঠানের নামে দরপত্র জমা দিয়ে প্রাণ–আরএফএল স্পষ্টভাবে আইন লঙ্ঘন করেছে। এই প্রতিষ্ঠানের মালিক যতই প্রভাবশালী হোক, তাদের অবশ্যই জবাবদিহি ও শাস্তির আওতায় আনতে হবে। এই অনিয়মে সরকারি পর্যায়ের যারা সহায়তা করেছে, তাদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।’
ভুয়া প্রতিষ্ঠান অর্থাৎ রংপুর মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ৩০৫ দশমিক ৩ কোটি টাকার কার্যাদেশের বিপরীতে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) দায় দাঁড়ায় প্রায় ৩০ দশমিক ৫ কোটি টাকা। প্রতিষ্ঠানটির অস্তিত্ব না থাকায় এই নামে ভ্যাট দাখিল করা হয়নি।
কারণ ব্যবহৃত বিআইএনটি অন্য প্রতিষ্ঠানের। ভ্যাট দেওয়া হয়ে থাকলেও তা প্রকৃত কোম্পানির রিটার্নের সঙ্গে মিলে যাবে। যাকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘ভ্যাট আড়াল করার পদ্ধতি’।
ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক আইনে কর ফাঁকির উপর ১০০ শতাংশ জরিমানা এবং মাসে ১ শতাংশ হারে সুদ ধার্য হয়। এ হিসাবে সম্ভাব্য দায় দাঁড়ায় প্রায় ৭৬ কোটি টাকা।
এতসব অনিয়মের পরও গত এক দশকে কোনো সংস্থা ব্যবস্থা নেয়নি। তবে চলতি বছরের জুনে এসে গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী নিয়াজ মো. তানভির আলম আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটিকে (বিপিপিএ) জানিয়েছেন, ২০১৬ সাল থেকেই ই-জিপিতে একই নামে দুটি আইডি ব্যবহার করে দরপত্রে অংশ নিচ্ছে প্রাণ-আরএফএল। অথচ আরজেএসসি নিবন্ধন আছে একটি প্রতিষ্ঠান। নির্বাহী প্রকৌশলী নিয়াজ মো. তানভির আলম প্রাণ-আরএফএলের বিষয়টিকে ‘জালিয়াতি’ বলে অ্যাখ্যা দিয়েছেন।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে প্রাণ-আরএফএল বলেছে, ‘লি. এবং লিমিটেড একই কোম্পানি, যা অ্যানালগ থেকে ডিজিটাল রূপান্তরের সময় দুটি নামে প্রদর্শিত হয়েছে। জালিয়াতির অভিযোগ সম্পূর্ণ অসত্য।’






















