পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত তৌফিকা ফুডস অ্যান্ড লাভেলো আইসক্রিম পিএলসি টানা পাঁচ বছর ধরে শত কোটি টাকার ব্যাংকঋণের তথ্য গোপন করেছে—এমন অভিযোগ উঠেছে ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলের (এফআরসি) তদন্তে। এই অনিয়মে নিরীক্ষকদেরও সম্পৃক্ততা থাকার ইঙ্গিত মিলেছে। বিষয়টি শুধু একটি কোম্পানির জালিয়াতি নয়, বরং দেশের আর্থিক প্রতিবেদন ও নিরীক্ষা ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সীমান্ত ব্যাংক লিমিটেড থেকে নেওয়া বিপুল অঙ্কের ঋণের তথ্য কোম্পানিটি আর্থিক প্রতিবেদনে আংশিক বা পুরোপুরি গোপন রেখেছে। এই সময়ে যথাক্রমে ৯ দশমিক ২৫ কোটি টাকা, ৩২ দশমিক ৫৫ কোটি টাকা, ৫২ দশমিক ৩৫ কোটি টাকা, ৭৩ দশমিক ৪৬ কোটি টাকা এবং ৮১ দশমিক ৯ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়।
এফআরসির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এসব ঋণের বিপরীতে দায় কম দেখানো হয়েছে। একই সঙ্গে কিছু ক্ষেত্রে ব্যাংকে জমা অর্থ বা সংশ্লিষ্ট আর্থিক অবস্থানও কম দেখানো হয়েছে। এর ফলে কোম্পানির নেট অ্যাসেট ভ্যালু (এনএভি) ও শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে—যা বিনিয়োগকারীদের বিভ্রান্ত করেছে।
তদন্তে উঠে এসেছে, এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং ধারাবাহিকভাবে একই কৌশলে কয়েক বছর ধরে আর্থিক প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। ফলে বাজারে প্রচারিত তথ্যের সঙ্গে কোম্পানির প্রকৃত আর্থিক অবস্থার বড় ফারাক তৈরি হয়েছে।
এফআরসি জানায়, ২০২০ ও ২০২১ সালের আর্থিক প্রতিবেদন নিরীক্ষা করেন ইসলাম কাজী শফিক অ্যান্ড কোম্পানির পার্টনার কাজী শফিকুল ইসলাম। পরবর্তী তিন বছর নিরীক্ষা করেন কাজী জহির অ্যান্ড কোংয়ের পার্টনার নজরুল হোসেন খান। তদন্তকারীদের মতে, প্রতিবছর বড় অঙ্কের ঋণ গোপন থাকা সত্ত্বেও তা নিরীক্ষায় ধরা না পড়া বা উপেক্ষিত হওয়া গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে।
Space for ads
এই প্রেক্ষাপটে কোম্পানি ও সংশ্লিষ্ট নিরীক্ষকদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এফআরসি। আর্থিক প্রতিবেদন জালিয়াতির অভিযোগে দেশে এটিই হতে পারে প্রথম ফৌজদারি মামলা, যা পুঁজিবাজারে গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে।
এদিকে কোম্পানিটিকে ঘিরে শেয়ার কারসাজির আশঙ্কাও খতিয়ে দেখছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আর্থিক জালিয়াতি ও শেয়ার কারসাজি—দুই অভিযোগই প্রমাণিত হলে এটি সাম্প্রতিক সময়ের বড় করপোরেট কেলেঙ্কারির একটি হয়ে উঠতে পারে।
বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমদ সিদ্দিকি বলেন, ‘ব্যাংকে কত ঋণ আছে, এটি গোপন বিষয় নয়। ব্যাংক স্টেটমেন্টেই এসব তথ্য থাকে। বছরের পর বছর দায় কম দেখানো হলে অডিটরদের ভূমিকা অবশ্যই প্রশ্নবিদ্ধ হবে।’
বিএসইসির মুখপাত্র ও পরিচালক মো. আবুল কালাম বলেন, কোম্পানিটির আর্থিক প্রতিবেদনে অনিয়মের অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। তদন্তে প্রমাণ মিললে সিকিউরিটিজ আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং বিভাগের অধ্যাপক আল-আমিন বলেন, ধারাবাহিকভাবে ঋণ গোপন এবং তা নিরীক্ষকদের চোখ এড়িয়ে যাওয়া পুরো আর্থিক প্রতিবেদন ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তিনি নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন।
দেশের আইসক্রিম বাজার বর্তমানে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকার এবং প্রতিবছর ৭ থেকে ৮ শতাংশ হারে বাড়ছে। তবে এই বাজারে উল্লেখযোগ্য অবস্থান তৈরি করতে না পারলেও আর্থিক প্রতিবেদনে লাভেলো আইসক্রিমকে তুলনামূলক শক্তিশালী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে—যা এখন প্রশ্নের মুখে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের ঘটনা প্রমাণ করে শুধু আর্থিক প্রতিবেদন দেখে বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে কোম্পানির প্রকৃত আর্থিক অবস্থার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।



















