দেশের গ্রামীণ অর্থনীতিকে ঢেলে সাজাতে এবং এক কোটিরও বেশি মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে ‘ওয়ান ভিলেজ ওয়ান প্রডাক্ট’ বা ওভিওপি প্রকল্প চালু করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
এর আওতায় দেশের ৬৪টি জেলার প্রত্যন্ত গ্রামের বিখ্যাত সব পণ্যকে বিশ্ববাজারে ছড়িয়ে দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। দেশের ৫২টি ব্যাংককে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এ প্রকল্পে। এতে অর্থায়ন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১০ হাজার কোটি টাকা।
‘ওয়ান ভিলেজ ওয়ান প্রডাক্ট’ প্রকল্পটি সফল করতে একটি কমিটি গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিনকে প্রধান করা হয়েছে।
গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংকে এ প্রকল্পের প্রাথমিক রূপরেখা পর্যালোচনায় একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মাসরুর আরেফিন বলেন, ‘ওয়ান ভিলেজ ওয়ান প্রডাক্ট’ প্রকল্পটি এগিয়ে নিতে আমরা কাজ করছি। এ প্রকল্পে দেশের ৫২টি ব্যাংক অন্তর্ভুক্ত। প্রাথমিক কাজগুলো এগিয়ে নিতে আমরা আজ (রোববার) বৈঠকে বসেছিলাম। সেখানে সিটি ব্যাংকের ডিএমডি আশানুর রহমান একটি প্রেজেন্টেশন দিয়েছেন। এতে প্রকল্পটির সম্ভাব্য সব দিক উঠে এসেছে। আশা করছি, সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় দেশের প্রান্তিক উদ্যোক্তাদের জন্য খুবই ভালো কিছু হবে।’
মাসরুর আরেফিন আরো বলেন, ‘দেশের প্রত্যন্ত অনেক গ্রামে বিভিন্ন বিখ্যাত পণ্য উৎপাদিত হয়। সেসব পণ্যের জাতীয় চাহিদার পাশাপাশি বিশ্ববাজারেও ভোক্তা রয়েছে। কিন্তু অর্থায়ন ও তত্ত্বাবধান না থাকায় এ খাতের বিস্তৃতি হচ্ছে না। ওয়ান ভিলেজ ওয়ান প্রডাক্ট প্রকল্পের মাধ্যমে আমরা প্রতিটি জেলার বিখ্যাত পণ্যকে বিশ্ববাজারে পৌঁছে দিতে চাই। সে লক্ষ্যেই সবাইকে নিয়ে কাজ করার চেষ্টা করছি।’
সভায় প্রকল্পটি বাস্তবায়নে একটি কৌশলপত্র উপস্থাপন করা হয়। এতে বলা হয়, বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার বড় হলেও সে হারে কর্মসংস্থান বাড়েনি। ২০০০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে দেশের এমপ্লয়মেন্ট ইলাস্ট্রিসিটি (কর্মসংস্থান স্থিতিস্থাপকতা) ১ দশমিক ১ থেকে দশমিক ১২-তে নেমে এসেছে।
প্রতি বছর শ্রমবাজারে আসছে নতুন ২০ লাখ মানুষ, অথচ ৮৪ শতাংশ কর্মী এখনো অনানুষ্ঠানিক খাতে আটকে আছেন।
অন্যদিকে রফতানির বাজার প্রায় পুরোটাই পরিচালিত হয় তৈরি পোশাক খাতকে কেন্দ্র করে। বিপরীতে প্রত্যন্ত এলাকা অর্থায়ন না থাকায় ব্র্যান্ডহীন এসব গ্রামীণ পণ্য বাজারে প্রবেশই করতে পারছে না। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ওভিওপি একটি কার্যকর সমাধান হতে পারে।
প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, দেশের ৬৪ জেলায় বিস্তৃতভাবে এ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে। এতে স্থানীয় পণ্যকে কেন্দ্র করে উৎপাদকদের সংগঠিত করে ‘ক্লাস্টার’ গড়ে তোলা হবে। প্রতিটি ক্লাস্টারে অন্তত ৫০ জন বা তার চেয়ে বেশি উৎপাদক থাকবে, যারা নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকায় (৫ কিলোমিটারের মধ্যে) কাজ করবে।
মোট সাতটি স্তম্ভের ওপর দাঁড় করানো হয়েছে উদ্যোগটিকে। এগুলো হলো পণ্য ও ক্লাস্টার নির্বাচন; ক্লাস্টার উন্নয়ন ও ভ্যালু চেইন সংযোগ; অর্থায়ন ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তি; বাজার, ব্র্যান্ডিং ও রফতানি; প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো; দক্ষতা উন্নয়ন এবং ডিজিটাল অবকাঠামো ও প্রযুক্তি।
এ উদ্যোগকে বাস্তবরূপ দিতে ‘বাংলাদেশ ওভিওপি’ নামে একটি জাতীয় ব্র্যান্ড তৈরির পরিকল্পনা করা হয়েছে, যেখানে রাজশাহীর আম বা জামদানি শাড়ির মতো ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক পরিচিতিকে কাজে লাগানো হবে।
পরিকল্পনাটি তিন ধাপে বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রথম বছরে ক্লাস্টার নির্বাচন, রেজিস্ট্রেশন ও অর্থায়ন, দ্বিতীয় বছরে জাতীয় পর্যায়ে সম্প্রসারণ, বাজার সংযোগ ও প্লাটফর্ম তৈরি এবং তৃতীয় বছরে ৬৮ হাজার গ্রামে পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন। এ সময়ের মধ্যে এক কোটির বেশি উৎপাদক ও উদ্যোক্তাকে যুক্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রচলিত জামানতভিত্তিক ঋণের বদলে এ উদ্যোগে ভ্যালু চেইনভিত্তিক অর্থায়ন চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ, সরবরাহ এবং রফতানির প্রতিটি ধাপে অর্থায়ন নিশ্চিত করা হবে।
এ উদ্যোগটিকে ‘ডিজিটাল-ফার্স্ট’ হিসেবে পরিকল্পনা করা হয়েছে। এতে প্রতিটি উৎপাদককে ডিজিটাল আইডির আওতায় আনা, বিকল্প তথ্যের ভিত্তিতে ক্রেডিট স্কোরিং করা এবং কিউআর কোডের মাধ্যমে পণ্যের ট্রেসেবিলিটি নিশ্চিত করা হবে।
পুরো প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করা হয়েছে। এর প্রায় অর্ধেকই বাজারে প্রবেশাধিকার ও ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যয় করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এ প্রকল্পে সরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে ৫-১০ গুণ পর্যন্ত বেসরকারি ঋণপ্রবাহ (প্রাইভেট ক্রেডিট) সম্প্রসারণ সম্ভব হবে বলেও আশা করা হচ্ছে।



















