স্বচ্ছতা, সুশাসন ও আন্তর্জাতিক মানের ব্যাংকিংয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে নিজেদের ‘সুশাসিত ব্যাংক’ হিসেবে তুলে ধরে ব্র্যাক ব্যাংক। তবে ২০২৫ সালের সমন্বিত নিট মুনাফার তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে ব্যাংকটির প্রকাশিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তি ও নিরিক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্যের মধ্যে বড় ধরনের গরমিল ধরা পড়েছে। সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে নিজেদের মুনাফা প্রায় ৪৩৫ কোটি টাকা বাড়িয়ে প্রচার করার মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের বিভ্রান্ত করার অভিযোগ উঠেছে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তি বনাম বার্ষিক প্রতিবেদন
গত ২৬ এপ্রিল পরিচালনা পর্ষদের সভা শেষে ব্র্যাক ব্যাংক এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। সেখানে দাবি করা হয়, ২০২৫ সালে ব্যাংকটি কর-পরবর্তী সমন্বিত নিট মুনাফা করেছে ২ হাজার ২৫১ কোটি টাকা, যা আগের বছরের ১ হাজার ৪৩২ কোটি টাকার তুলনায় ৫৭ শতাংশ বেশি। এছাড়া একক ভিত্তিতে নিট মুনাফা ১ হাজার ৫৮১ কোটি টাকা (৩০% বৃদ্ধি) হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। এই তথ্য দেশের প্রধান প্রধান গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়।
তবে ব্যাংকটির নিরীক্ষিত বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় উঠে এসেছে ভিন্ন চিত্র। প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৫ সালে ব্র্যাক ব্যাংকের মূল শেয়ারহোল্ডারদের জন্য প্রযোজ্য প্রকৃত সমন্বিত নিট মুনাফা ছিল ১ হাজার ৮১৬ কোটি ২৭ লাখ টাকা। অর্থাৎ সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে প্রচারিত তথ্যের চেয়ে প্রকৃত মুনাফা ৪৩৪ কোটি ৬৭ লাখ টাকা কম।
সহযোগী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যালঘু অংশের মুনাফা অন্তর্ভূক্ত করার চাতুরি
আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০২৫ সালে ব্র্যাক ব্যাংক ও এর সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর (যেমন: বিকাশ, ব্র্যাক ইপিএল, ব্র্যাক আইটি ইত্যাদি) সম্মিলিত নিট মুনাফা ছিল ২ হাজার ২৫০ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই পুরো অঙ্কটিকেই ব্যাংকের নিজেদের সমন্বিত মুনাফা বলে চালিয়ে দেওয়া হয়।
কিন্তু বিকাশ (৫১%), ব্র্যাক ইপিএল ইনভেস্টমেন্ট (৯৯.৯৫%), ব্র্যাক ইপিএল স্টক ব্রোকারেজ (৯০%), ব্র্যাক সজন (৯৮.০৮%) কিংবা ব্র্যাক আইটিতে (১০%) ব্র্যাক ব্যাংকের শতভাগ মালিকানা নেই। আন্তর্জাতিক হিসাবমান (IAS) অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠানের সংখ্যালঘু শেয়ারহোল্ডারদের (Non-Controlling Interest) প্রাপ্য ৪৩৪ কোটি ৬৭ লাখ টাকা বাদ দেওয়ার পরই মূল ব্র্যাক ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডারদের প্রকৃত মুনাফা নির্ধারিত হয়। সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ বাদ না দিয়েই নিজেদের পারফরম্যান্স বড় করে দেখানো হয়েছে।
ইপিএস হিসাবে প্রকাশ পেয়েছে প্রকৃত সত্য
মজার বিষয় হলো, শেয়ারপ্রতি আয় বা ইপিএস (EPS) হিসাব করার সময় ব্যাংকটি নিজেদের প্রকাশিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তির ২,২৫১ কোটি টাকাকে হিসাবের মধ্যে নেয়নি। বার্ষিক প্রতিবেদনের ৫৬০ নম্বর পৃষ্ঠার নোট-৪৫ অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক হিসাবমান আইএএস-৩৩ (IAS-33) অনুসরণ করে প্রকৃত সমন্বিত নিট মুনাফা ১,৮১৬ কোটি ২৭ লাখ টাকাকে ভিত্তি ধরেই ইপিএস ৯ টাকা ১২ পয়সা হিসাব করা হয়েছে। ফলে আর্থিক প্রতিবেদনের ভেতরেই ব্যাংকটির দুই ধরনের তথ্যের বৈপরীত্য ধরা পড়ে।
বিশেষজ্ঞ ও খাত সংশ্লিষ্টদের প্রতিক্রিয়া
পুঁজিবাজার ও ব্যাংকিং খাতের বিশেষজ্ঞরা বিষয়টি স্বাভাবিকভাবে দেখছেন না।
একটি শীর্ষস্থানীয় মার্চেন্ট ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ও চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট বলেন, “নিজেদের পারফরম্যান্স কৃত্রিমভাবে বড় করে দেখানোর জন্যই ব্র্যাক ব্যাংক এমন প্রচার চালিয়েছে। ব্যাংকটির উচিত নিজেদের ভুল স্বীকার করে ভবিষ্যতে এ ধরনের বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো থেকে বিরত থাকা।”
অপর একটি শীর্ষ ব্যাংকের সিইও মন্তব্য করেন, “সুশাসনের প্রতীক হিসেবে দাবি করা একটি ব্যাংকের কাছ থেকে এই ধরনের তথ্য উপস্থাপন কোনোভাবেই কাম্য নয়।”
আইনি ঝুঁকি ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরে আসার সম্ভাবনা
শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির ক্ষেত্রে যেকোনো বিভ্রান্তিকর আর্থিক তথ্য বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তে সরাসরি প্রভাব ফেলে। সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অর্ডিন্যান্স, ১৯৬৯ এবং সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ (প্রতারণামূলক কার্যক্রম) বিধিমালা, ২০২২ অনুযায়ী মিথ্যা বা অসত্য তথ্য প্রকাশ করে বিনিয়োগকারীদের প্রভাবিত করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের মনগড়া তথ্য প্রকাশের বিষয়টি খতিয়ে দেখে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) নিরপেক্ষ তদন্ত বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে।



















