দেশে মোবাইলভিত্তিক আর্থিক সেবায় (এমএফএস) গ্রাহক সংখ্যা ১৪ কোটি ৫৮ লাখ ছাড়িয়েছে । মাসে লেনদেন হচ্ছে প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা । বিপুল এই পরিসংখ্যানের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক হতাশাজনক চিত্র। এক যুগ পার হলেও সেবাটি এখনও টাকা পাঠানো আর নগদ উত্তোলনের চক্রেই বন্দি হয়ে আছে । নগদবিহীন লেনদেনে বিপ্লব আনার যে মূল উদ্দেশ্য ছিল, তা প্রায় ভেস্তে যেতে বসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনই এই স্থবিরতার চিত্র তুলে ধরেছে ।
পরিসংখ্যানের আড়ালে হতাশা
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই মাসে এমএফএসে প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে । এর মধ্যে ৮৫ শতাংশেরও বেশি লেনদেন হয়েছে ক্যাশ ইন, ক্যাশ আউট এবং ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি পর্যায়ে অর্থ স্থানান্তরে । বিপরীতে, দোকানপাট বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে কেনাকাটার বিল পরিশোধ বা মার্চেন্ট পেমেন্ট হয়েছে মোট লেনদেনের মাত্র সাড়ে ৪ শতাংশ । সেবাটি চালুর মূল লক্ষ্য ছিল নগদ টাকার ওপর নির্ভরতা কমানো, কিন্তু বাস্তবতা হলো, মানুষের মধ্যে নগদ টাকার চাহিদা না কমে উল্টো বাড়ছে ।
কেন এই অনাগ্রহ?
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এর পেছনে রয়েছে বহুমাত্রিক কারণ। দেশজুড়ে নগদবিহীন লেনদেনের অবকাঠামোর দুর্বলতা, ব্যবসায়ীদের মধ্যে রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার মানসিকতা এবং কালো টাকার প্রভাব ডিজিটাল লেনদেনের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ।
এর বাস্তব চিত্র মেলে রাজধানীর বাজারগুলোতে। সম্প্রতি পুরান ঢাকার একটি বিখ্যাত মিষ্টির দোকানে কেনাকাটা করতে গিয়ে এমনই অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হন ব্যাংক কর্মকর্তা সালাহউদ্দীন। বিল পরিশোধের জন্য তিনি কিউআর কোড স্ক্যান করতে চাইলে দোকানদার জানান, তাদের প্রতিষ্ঠানে নগদ ছাড়া অন্য কোনো মাধ্যমে বিল নেওয়ার ব্যবস্থা নেই । কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘যাদের কাছ থেকে কাঁচামাল কিনি, তাদের নগদ টাকা দিতে হয়। তারা এমএফএসে টাকা নিতে চান না। এছাড়া ভ্যাটের বাড়তি ঝামেলা তো আছেই।’
ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে প্রায় ১৪ লাখ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এমএফএসে লেনদেন করার যোগ্য হলেও তাদের ৭০ শতাংশই এই ব্যবস্থা ব্যবহার করছেন না ।
রাষ্ট্রের লোকসান হাজার হাজার কোটি
ডিজিটাল লেনদেনে এই স্থবিরতার কারণে রাষ্ট্রকে বিপুল আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর সম্প্রতি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘শুধু নগদ টাকা ব্যবস্থাপনার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংককে প্রতি বছর ২০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, দেশ ক্যাশলেস না হওয়ায় সরকারের রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে বছরে অন্তত দেড় লাখ কোটি টাকা । বর্তমানে প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকার মুদ্রিত নোট ব্যাংক ব্যবস্থার বাইরে রয়েছে, যা বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় বেশি ।
উত্তরণের পথ কী?
এই অচলাবস্থা কাটাতে বিশেষজ্ঞরা বেশ কিছু পরামর্শ দিয়েছেন। ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের (ইউসিবি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মামদুদুর রশীদ বলেন, ভারতের মতো একটি ইন্টারঅপারেবল পেমেন্ট গেটওয়ে তৈরি করা এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কয়েক বছরের জন্য কর ছাড় দিয়ে ডিজিটাল ব্যবস্থায় উৎসাহিত করা যেতে পারে । বিকাশের চিফ কমার্শিয়াল অফিসার আলী আহম্মেদ মনে করেন, সব আর্থিক প্রতিষ্ঠানের যৌথ অংশীদারত্বের মাধ্যমে ডিজিটাল পেমেন্টের সম্প্রসারণ সম্ভব ।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংক ‘বাংলা কিউআর’ কোডকে জনপ্রিয় করার উদ্যোগ নিচ্ছে। গভর্নর আহসান এইচ মনসুর জানিয়েছেন, প্রতিটি ব্যবসার লাইসেন্স অনুমোদনের সময় কিউআর কোড বাধ্যতামূলক করার জন্য সংশ্লিষ্টদের অনুরোধ করা হয়েছে । তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শক্তিশালী অবকাঠামো তৈরি ও ব্যবসায়ীদের আস্থা অর্জন ছাড়া এই বৃত্ত থেকে বের হওয়া কঠিন। কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে মোবাইল ব্যাংকিং কেবলই টাকা পাঠানোর দ্রুতগতির মাধ্যম হয়েই থাকবে, যা ডিজিটাল অর্থনীতির মূল লক্ষ্যের সঙ্গে এক বড় বৈপরীত্য।






















