বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের ব্যাংকিং খাতে ব্যাপক রদবদল হলেও, গুরুতর অনিয়ম, দুর্নীতি এবং খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির অভিযোগের পরও বহাল তবিয়তে রয়েছেন যমুনা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মির্জা ইলিয়াছ উদ্দিন আহমেদ। শিক্ষাগত যোগ্যতার ঘাটতি এবং কেনাকাটায় দুর্নীতির মাধ্যমে সাবেক মন্ত্রীপুত্রকে সহায়তার অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি স্বপদে টিকে গেছেন, যা ব্যাংকিং খাতের সুশাসন নিয়ে আবারও বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছে।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক তদন্তে তার বিরুদ্ধে গুরুতর সব অভিযোগের প্রমাণ মিলেছে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি সাবেক স্থানীয় সরকার মন্ত্রী তাজুল ইসলামের পুত্র ও ব্যাংকের তৎকালীন চেয়ারম্যান মো. সাইদুল ইসলামের যোগসাজশে ব্যাংক থেকে শত শত কোটি টাকা লুটপাটে সহায়তা করেছেন। এই সময়ে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণও বেড়েছে আশঙ্কাজনক হারে।
যেভাবে হয়েছে ৭৫ কোটি টাকার লুটপাট
দুদক সূত্রে জানা গেছে, যমুনা ব্যাংকের তৎকালীন চেয়ারম্যান এবং সাবেক মন্ত্রী তাজুল ইসলামের ছেলে মো. সাইদুল ইসলাম, ২০২৩ সালের আগস্ট মাসে অনুষ্ঠিত একটি বোর্ড সভায় ক্ষমতার অপব্যবহার করেন। তিনি আইটি বিভাগের জন্য মাত্র ১৫ কোটি টাকা মূল্যের হার্ডওয়্যার ও অন্যান্য সরঞ্জামাদির ক্রয়মূল্য প্রায় ৯০ কোটি টাকা দেখিয়ে সেই প্রস্তাব জোরপূর্বক পাস করিয়ে নেন। অতিরিক্ত দেখানো প্রায় ৭৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়। এই অনৈতিক কাজে তাকে সরাসরি সহায়তা করেন এমডি মির্জা ইলিয়াছ উদ্দিন আহমেদ। দুর্নীতির এই মহোৎসবে ব্যাংকের পরিচালক রেদোয়ান কবির আনসারী, রবিন রাজন সাখাওয়াত এবং আইটি বিভাগের প্রধানও জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এই আইটি কেলেঙ্কারির অভিযোগটি ২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) গেলে তা নতুন করে আলোচনায় আসে। বর্তমানে দুদক অভিযোগটি অনুসন্ধান করছে। এদিকে, শত কোটি টাকার বেশি আত্মসাতের অভিযোগে অভিযুক্ত সাবেক চেয়ারম্যান সাইদুল ইসলাম দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছেন বলে জানা গেছে।
নিয়ম ভেঙে ‘অযোগ্য’ এমডির নিয়োগ ও পুনর্নিয়োগ
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রবিধি অনুযায়ী, কোনো তফসিলি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে শিক্ষাজীবনের কোনো পর্যায়ে তৃতীয় বিভাগ বা শ্রেণী গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু যমুনা ব্যাংকের বর্তমান এমডি মির্জা ইলিয়াছ উদ্দিন আহমেদের শিক্ষাজীবনে তৃতীয় বিভাগ রয়েছে।
- প্রথম নিয়োগ (২০১৯): ২০১৯ সালে যখন তাকে প্রথমবার এমডি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়, তখনও বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০১৮ সালের সার্কুলার লঙ্ঘন করা হয়েছিল।
- পুনর্নিয়োগ (২০২২): ২০২২ সালে তার মেয়াদ শেষ হলে, তৎকালীন স্থানীয় সরকার মন্ত্রী তাজুল ইসলাম এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গাজী গোলাম দস্তগীরের ছেলের (যিনি ব্যাংকের পরিচালক) সুপারিশে ও রাজনৈতিক প্রভাবে বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেদের নিয়ম ভেঙেই তাকে আরও পাঁচ বছরের জন্য পুনর্নিয়োগের অনুমোদন দেয়।
ব্যক্তিগত হিসাবেও সন্দেহজনক লেনদেন, বেড়েছে খেলাপি ঋণ
শুধু নিয়োগ কেলেঙ্কারিই নয়, মির্জা ইলিয়াছ উদ্দিন আহমেদের ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবেও সন্দেহজনক লেনদেনের খোঁজ পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদনে দেখা যায়, এমডির বেতন-ভাতার জন্য পরিচালিত ব্যাংক হিসাবে বেতন ছাড়াও নগদ এবং অনলাইন ট্রান্সফারের মাধ্যমে প্রায় ৬৭ লাখ ৫৮ হাজার টাকা জমা হয়েছে, যার কোনো সুস্পষ্ট উৎস পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, তার সময়ে ব্যাংকের আর্থিক স্বাস্থ্যেরও ব্যাপক অবনতি ঘটেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২১ সালের তুলনায় ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ ৪৪১ কোটি ৫৬ লাখ টাকা থেকে দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে ৯৬০ কোটি ৬৫ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ৫.৩২ শতাংশ।
বিগত সরকারের পতনের পর যেখানে ব্যাংকিং খাতের অনেক রুই-কাতলার পদে পরিবর্তন এসেছে, সেখানে এত গুরুতর ও সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও মির্জা ইলিয়াছ উদ্দিন আহমেদের স্বপদে বহাল থাকাটা নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা এবং ব্যাংকিং খাতের সুশাসনকে এক কঠিন প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।






















