পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠান ফিনিক্স ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের বিরুদ্ধে ‘পাতানো’ বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) আয়োজন করে বিনিয়োগকারীদের প্রশ্ন করার সুযোগ না দিয়েই ভুলে ভরা আর্থিক প্রতিবেদন পাস করানোর মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি এবং আর্থিক প্রতিবেদনে অসঙ্গতি আড়াল করার অভিযোগ এনে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন একজন ভুক্তভোগী বিনিয়োগকারী।
এই অভিযোগের পাশাপাশি কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অনিয়ম-দুর্নীতিতে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ডুবে গেছে। বিতরণ করা ঋণের ৮৪ শতাংশের বেশি খেলাপি হয়ে পড়েছে এবং প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে তারল্য সংকটের পাশাপাশি বিপুল মূলধন ঘাটতিতে রয়েছে।
‘পাতানো এজিএম’, প্রশ্ন করতে বাধা
বিনিয়োগকারীর অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, গত ২১ আগস্ট ২০২৫ তারিখে আইডিইবি ভবনে অনুষ্ঠিত ফিনিক্স ফাইন্যান্সের এজিএমে একজন বিনিয়োগকারী বার্ষিক প্রতিবেদনের অসঙ্গতি নিয়ে প্রশ্ন করার চেষ্টা করেন। কিন্তু কোম্পানির কিছু কর্মকর্তা, “কন্টাক্ট করা পক্ষের শেয়ারহোল্ডার এবং ভাড়া করা কিছু নন-শেয়ারহোল্ডার” তাকে বাধা দেয়।
অভিযোগে বলা হয়, এসব সভায় কৃত্রিম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে প্রকৃত বিনিয়োগকারীদের প্রশ্ন করার সুযোগ না দিয়েই ভুলে ভরা প্রতিবেদন পাস করা হচ্ছে। ফলে কোম্পানির প্রকৃত আর্থিক অবস্থা আড়াল হয়ে যাচ্ছে এবং জবাবদিহিতা সম্পূর্ণভাবে হারিয়ে যাচ্ছে। ওই বিনিয়োগকারী পরে লিখিতভাবে প্রশ্ন জমা দিলেও কোনো উত্তর পাননি।
দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনায় ডুবছে প্রতিষ্ঠান
ব্যাংক-বহির্ভূত এই আর্থিক প্রতিষ্ঠানটির এমন দুর্দশার জন্য অযোগ্য নেতৃত্বকেই দায়ী করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। প্রতিষ্ঠানটির সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এসএম ইন্তেখাব আলম ২০০৮ সাল থেকে টানা ১৬ বছর এই পদে দায়িত্ব পালন করেন। সম্প্রতি অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ মেলায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাকে বরখাস্ত করে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চিঠিতে এস এ অয়েল রিফাইনারি, আমান সিমেন্ট মিলস, মনোস্পুল পেপারসহ একাধিক গ্রাহকের ঋণে অনিয়মের সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে প্রশাসনিক ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ভয়াবহ আর্থিক সংকট
বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষণ এবং কোম্পানির নিজস্ব আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফিনিক্স ফাইন্যান্সের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক:
- খেলাপি ঋণের বোঝা: জুন মাস পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ ২ হাজার ৬৪৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি হয়ে পড়েছে ২ হাজার ২৩৪ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৮৪.৩৬ শতাংশ।
- আস্থার সংকট ও তারল্য: প্রতিষ্ঠানটির প্রতি আস্থার সংকট থাকায় নতুন আমানতও পাচ্ছে না। তীব্র তারল্য সংকটের কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত নগদ জমার হার (সিআরআর) ও বিধিবদ্ধ জমার হার (এসএলআর) সংরক্ষণেই ব্যর্থ হচ্ছে।
- লোকসানের পাহাড়: ২০১৯ সালের পর থেকে শেয়ারহোল্ডারদের কোনো লভ্যাংশ দেয়নি কোম্পানিটি। গত অর্থবছরে কর-পরবর্তী ক্ষতি দেখিয়েছে ৮০৮ কোটি ৯৬ লাখ টাকা।
- সম্পদের চেয়ে দায় বেশি: ফিনিক্স ফাইন্যান্সের মোট সম্পদ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৭৫৮ কোটি টাকা, যেখানে মোট দায় ৪ হাজার ১৮৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ, সম্পদের তুলনায় দায় প্রায় ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা বেশি।
- মূলধন বিলীন: প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) দাঁড়িয়েছে ঋণাত্মক ৪৮.৭৩ টাকা এবং শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য (এনএভি) ঋণাত্মক ৮২.০১ টাকা। প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারহোল্ডার ইক্যুইটি এখন নেগেটিভ ১ হাজার ৩৬০ কোটি ৩০ লাখ টাকা, যা ইঙ্গিত করে যে প্রতিষ্ঠানটি কার্যত তার সমস্ত মূলধন হারিয়ে ফেলেছে।
প্রতিবেদনেও অসঙ্গতির অভিযোগ
অভিযোগকারী বিনিয়োগকারী বিএসইসির কাছে দেওয়া চিঠিতে বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তার দাবি, ২০২৪ অর্থবছরের প্রকৃত ক্ষতি ২৩৮ কোটি ৭৯ লাখ টাকা হলেও প্রতিবেদনে লোকসান দেখানো হয়েছে ৮০৮ কোটি ২৩ লাখ টাকা। তিনি ভবিষ্যৎ ক্ষতির জন্য রাখা বিপুল পরিমাণ সংস্থান (প্রভিশন) এবং এই অর্থের উৎস নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের সাজানো এজিএম এবং আর্থিক প্রতিবেদনে অসত্য তথ্য উপস্থাপন বাজারে আস্থাহীনতা সৃষ্টি করছে। যদি নিয়ন্ত্রক সংস্থা দ্রুত ব্যবস্থা না নেয়, তবে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা আরও নিরুৎসাহিত হবে।





















