শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত প্রিমিয়ার ব্যাংক পিএলসি থেকে গ্রাহকদের আমানতের হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণের নামে আত্মসাৎ করা হয়েছে, যার নেতৃত্বে ছিলেন ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান এইচ বি এম ইকবাল ও তার পরিবার। এসব ঋণ খেলাপি হয়ে যাওয়ায় এবং আদায় অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় ব্যাংকটির বিশাল অংকের নিরাপত্তা সঞ্চিতি (প্রভিশন) গঠন করার কথা ছিল।
কিন্তু সেই প্রভিশন গঠন না করে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ২০২৪ সালের আর্থিক হিসাবে ৬ হাজার ৫৩ কোটি টাকার বিশাল লোকসানকে ১৩৪ কোটি ৪৪ লাখ টাকা মুনাফা হিসেবে দেখিয়েছে। অর্থাৎ, শেয়ারপ্রতি (৪৯) টাকা লোকসানকে ১ টাকা ০৯ পয়সা মুনাফা দেখানো হয়েছে, যা ব্যাংকটির নিরীক্ষা প্রতিবেদন পর্যালোচনায় উঠে এসেছে।
ব্যাংক খাতের সংশ্লিষ্টদের মতে, রাজনৈতিক প্রভাবে ব্যাংক দখল করে সালমান এফ রহমান, এস. আলম ও ইকবালের মতো চক্রগুলো অস্তিত্বহীন ও অযোগ্য প্রতিষ্ঠানকে ঋণের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এর মাধ্যমে তারা গ্রাহকদের আমানতকে চরম ঝুঁকিতে ফেলেছে। এসব চক্রের কারণেই এখন অনেক ব্যাংক গ্রাহকদের আমানত ফেরত দিতে পারছে না।
আর্থিক হিসাবে শুভঙ্করের ফাঁকি
প্রিমিয়ার ব্যাংকের ২০২৪ সালের নিরীক্ষিত আর্থিক হিসাবে শেয়ারপ্রতি ১.০৯ টাকা করে মোট নিট মুনাফা দেখানো হয়েছে ১৩৪ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। একইসঙ্গে শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদ মূল্য (এনএভিপিএস) দেখানো হয়েছে ২১ টাকা ৭৩ পয়সা (মোট ২,৬৮০ কোটি ২৫ লাখ টাকা)।
তবে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ২০২৪ সালে ব্যাংকটির মোট ৮ হাজার ১১৪ কোটি ২ লাখ টাকা প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি দরকার ছিল। এর বিপরীতে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ সঞ্চিতি করেছে মাত্র ১ হাজার ৯২৬ কোটি ২৬ লাখ টাকা। অর্থাৎ, ব্যাংকটির সঞ্চিতি ঘাটতি রয়েছে ৬ হাজার ১৮৭ কোটি ৭৬ লাখ টাকা।
এই বিশাল ঘাটতি গোপন করে ব্যাংকটি অতিরঞ্জিত সম্পদ, মুনাফা ও ইক্যুইটি দেখিয়েছে এবং নিজেদের প্রকৃত দায় কম দেখিয়েছে।
নিরীক্ষকের মতে, আন্তর্জাতিক হিসাব মান (আইএএস) অনুযায়ী ব্যাংকটির ২০২৪ সালেই এই ৬,১৮৭ কোটি ৭৬ লাখ টাকা সঞ্চিতি গঠন করা দরকার ছিল। যদি তা করা হতো, তাহলে ওই বছরে ব্যাংকটির নিট লোকসান দাঁড়াত ৬ হাজার ৫৩ কোটি ৩২ লাখ টাকা এবং শেয়ারপ্রতি লোকসান হতো (৪৯) টাকা।
একইভাবে, প্রয়োজনীয় সঞ্চিতি গঠন করা হলে ব্যাংকটির শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদ ২১.৭৩ টাকা থেকে কমে ঋণাত্মক (২৮) টাকায় নেমে আসত এবং মোট নিট সম্পদ দাঁড়াত ঋণাত্মক ৩ হাজার ৫০৭ কোটি ৫১ লাখ টাকা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা ও বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যাংকটির অপর্যাপ্ত মুনাফার কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক ওই বিশাল অংকের সঞ্চিতি ঘাটতি দেখানোর বিষয়টি ভবিষ্যতে করার সুযোগ দিয়েছে। তবে নিয়ন্ত্রক সংস্থার এই সুযোগ আন্তর্জাতিক হিসাব মানের সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ব্যাংকটিকে এখন সঞ্চিতি গঠন থেকে ছাড় দিলেও ভবিষ্যতে এই ঘাটতি পূরণ করতে হবে। এর প্রভাব এখন না দেখিয়ে ভবিষ্যতে দেখানোর এই সুযোগ দেওয়া এক ধরনের বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে প্রতারণা।
২০০৭ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া প্রিমিয়ার ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন ১ হাজার ২৩৩ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ব্যাংকটির মোট শেয়ারের ৭৬.০৮ শতাংশের মালিক সাধারণ বিনিয়োগকারীরা (উদ্যোক্তা/পরিচালক ব্যতীত), যারা ব্যাংকটির এই জালিয়াতির কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। কোম্পানিটির শেয়ার দর বর্তমানে ৬ টাকা ৪০ পয়সায় অবস্থান করছে।





















