মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে অবৈধ অনলাইন জুয়ার রমরমা লেনদেন এবং হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার প্রতিরোধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক সম্প্রতি দেশের ১৩টি এমএফএস সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানকে চিঠি দিয়ে জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দিয়েছে।
তবে এমএফএস অপারেটররা বলছেন, এসব লেনদেনের ধরন শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব। তাদের মতে, পার্সন-টু-পার্সন (পি-টু-পি) বা সেন্ড মানি লেনদেনের প্রকৃত উদ্দেশ্য সহজে নির্ণয় করা যায় না। অন্যদিকে, কিছু এজেন্ট বা মার্চেন্ট একাধিক স্তরের স্থানান্তরের মাধ্যমে এমএফএস অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে জুয়ার সাইটগুলোতে বড় অঙ্কের টাকা পাচার করতে পারে, যা ট্র্যাক করা আরও কঠিন।
৫ হাজার কোটি টাকা পাচারের আশঙ্কা
অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে দেশ থেকে ঠিক কী পরিমাণ অর্থ পাচার হচ্ছে, তার কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য কোনো সংস্থার কাছে নেই। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, “এই অঙ্ক প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা হতে পারে।”
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) ইতোমধ্যে দেশে পরিচালিত সব জুয়ার ওয়েবসাইট বন্ধ করে দিলেও, ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক (ভিপিএন) ব্যবহার করে জুয়া খেলা অব্যাহত রয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর নির্দেশনা
এমএফএস প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে অবৈধ জুয়ার মাধ্যমে বিদেশে টাকা পাচার হচ্ছে বলে সতর্ক করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে জরুরি ভিত্তিতে সন্দেহজনক অ্যাকাউন্টগুলোর তালিকা তৈরি করার নির্দেশ দিয়েছে।
চিঠিতে সব এমএফএস প্রতিষ্ঠানকে একটি ‘টাস্ক ফোর্স’ গঠন করতে এবং জুয়া শনাক্তকরণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) যুক্ত স্বয়ংক্রিয় মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া জুয়া-সংক্রান্ত অভিযোগ জানানোর জন্য একটি পাবলিক রিপোর্টিং পোর্টাল ও হেল্পলাইন চালুর নির্দেশনাও দেওয়া হয়।
গৃহীত পদক্ষেপ পর্যালোচনা করতে বাংলাদেশ ব্যাংক আগামী ৬ নভেম্বর সাতটি এমএফএস অপারেটরের সঙ্গে বৈঠক করার পরিকল্পনা করেছে।
যেভাবে চলে জুয়ার লেনদেন
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সাবেক একজন পেশাদার জুয়ারি জানান, জুয়াড়িরা বেটিং অ্যাপে একটি প্রোফাইল খোলেন। অ্যাপ থেকে তাদের এমএফএসের একটি বিজনেস অ্যাকাউন্ট নম্বর দেওয়া হয় এবং অন্য একটি অ্যাকাউন্ট থেকে সেই বিজনেস অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠাতে হয়। জুয়ায় জিতলে সেই টাকা উত্তোলনও করা হয় এমএফএসের মাধ্যমেই।
তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, বাংলাদেশিরা বেটিং অ্যাপে হেরে গেলে সেই টাকা সহজেই দেশ থেকে পাচার হয়ে যায়। কিন্তু যখন তারা জেতে, তখন সেই অর্থ দেশে আনতে একাধিক বাধার সম্মুখীন হতে হয়।
এমএফএস’র প্রযুক্তিগত দুর্বলতা
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল তানভীর হাসান জোহা বলেন, “আজ পর্যন্ত অনলাইন প্ল্যাটফর্মে যেসব জুয়া সংঘটিত হয়েছে, নিঃসন্দেহে সেগুলোর লেনদেন হয়েছে এমএফএসের মাধ্যমে; ব্যাংক অ্যাকাউন্টে এগুলো লেনদেন হয় না।”
তিনি মনে করেন, এমএফএসগুলোতে যে টাস্কফোর্স গঠন করতে বলা হয়েছে, তা প্রযুক্তিগত সহায়তা ছাড়া সম্পূর্ণ ব্যর্থ হবে। তিনি বলেন, “কার্যকর মনিটরিঙের জন্য ওপেন-সোর্স ইন্টিলিজেন্স এবং এমএফএসের আরটিজিএসের মাধ্যমে সাহায্য নিতে হবে।”
বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, একা বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে অনলাইন জুয়ার কার্যক্রম বন্ধ করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক মহাপরিচালক তৌফিক আহমদ চৌধুরী বলেন, “কোথায় এ ধরনের লেনদেন হচ্ছে, তা ট্র্যাক করার সক্ষমতা নেই বাংলাদেশ ব্যাংকের। বিশেষ করে জুয়া-সংক্রান্ত লেনদেন ব্যাংক ও এমএফএসকেই শনাক্ত করতে হবে। পরবর্তীতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যবস্থা নেবে।”
এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলোর বক্তব্য
নগদের মিডিয়া অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের প্রধান মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম বলেন, “সেন্ড মানি বা পার্সন-টু-পার্সন লেনদেনের ক্ষেত্রে প্রধান প্রতিবন্ধকতা হলো, শুধু নগদ নয়, কারও পক্ষেই বোঝা সম্ভব নয় যে লেনদেনটির আসল উদ্দেশ্য কী। তারপরেও নগদ সব সময়ই সন্দেহভাজন লেনদেনের ওপর খেয়াল রাখে এবং সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে অবহিত করা হয়।”
বিকাশের কর্পোরেট কমিউনিকেশনস বিভাগের প্রধান শামসুদ্দিন হায়দার ডালিম বলেন, “যদি কোনো অ্যাকাউন্টের লেনদেন সন্দেহজনক মনে হয়, আমরা স্বেচ্ছায় তা বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটকে (বিএফআইইউ) জানাই। অবৈধ লেনদেন প্রতিরোধে বিকাশের কাছে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষিত কর্মী রয়েছে।”
সমন্বিত উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক
অনলাইন জুয়া প্রতিরোধের লক্ষ্যে গতকাল (৩ নভেম্বর) বিটিআরসি-তে একটি উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। এতে সভাপতিত্ব করেন ডাক মন্ত্রণালয়ের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব। বৈঠকে ডিজিএফআই, এনএসআই, এনটিএমসি, ন্যাশনাল সাইবার সিকিউরিটি এজেন্সি, সিআইডি এবং বাংলাদেশ ব্যাংকসহ বিভিন্ন দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উপস্থিত থাকার কথা ছিল।





















