চট্টগ্রাম বন্দরের লালদিয়া কন্টেইনার টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনার দায়িত্ব ডেনমার্কের বিশ্বখ্যাত ‘এপিএম টার্মিনালস’-কে দেওয়া নিয়ে যে বিতর্ক উঠেছে, তাকে ‘বিশেষ অজ্ঞদের হাউকাউ’ এবং ‘দুর্নীতিবাজদের স্বার্থে আঘাত’ বলে অভিহিত করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
তারা স্পষ্ট করেছেন, এই প্রকল্পের মালিকানা সম্পূর্ণ বাংলাদেশের থাকছে এবং শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বন্দরের মতো কোনো ঋণের ফাঁদে দেশ পা দেয়নি। উল্টো, ৬,৭০০ কোটি টাকার পুরোটাই বিনিয়োগ করছে ড্যানিশ প্রতিষ্ঠানটি।
‘দেশ বিক্রি হয়ে যাচ্ছে’ বা ‘মালিকানা বিদেশিদের হাতে চলে যাচ্ছে’—এমন সব উদ্বেগের জবাবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা একটি প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে পুরো বিষয়টি পরিষ্কার করেছেন।
মালিকানা বাংলাদেশের, এপিএম শুধু ‘ড্রাইভার’ ‘পোর্টের মালিকানা কি বিদেশিদের হাতে চলে যাচ্ছে?’—এই প্রশ্নের জবাবে বলা হয়েছে, “প্রশ্নই আসে না! বন্দরের মালিকানা বাংলাদেশের কাছেই থাকছে।”
লালদিয়া চরে ডেনমার্কের এপিএম টার্মিনালস সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে (প্রায় ৬,৭০০ কোটি টাকা) একটি নতুন, বিশ্বমানের টার্মিনাল নকশা ও নির্মাণ করবে। এই টার্মিনালের মালিক হবে বাংলাদেশ। নির্মাণ শেষে এপিএম একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য শুধু ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকবে।
বিষয়টিকে উদাহরণ দিয়ে বোঝানো হয়েছে: “মনে করুন, গাড়িটা আমাদের। তারা (এপিএম) ড্রাইভার। তাহলে কি গাড়িটা তার হয়ে গেলো?”
শ্রীলঙ্কার পথে হাঁটেনি বাংলাদেশ এই প্রকল্পকে শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বন্দরের সাথে তুলনাকেও সম্পূর্ণ অমূলক বলা হয়েছে। হাম্বানটোটা গভীর সমুদ্র বন্দর চীনা ঋণে নির্মিত হয়েছিল। সেই ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় শ্রীলঙ্কা ৯৯ বছরের জন্য বন্দরটি চীনা কোম্পানির কাছে ইজারা দিতে বাধ্য হয়।
লালদিয়ার ক্ষেত্রে সরকার কোনো ঋণ নেয়নি। এটি একটি পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (PPP) প্রকল্প, যেখানে সম্পূর্ণ বিনিয়োগ করছে প্রাইভেট পার্টনার (এপিএম)। সাইনিং মানি হিসেবে ২৫০ কোটি টাকা এবং নির্মাণকালে সব মিলিয়ে প্রায় ৬,৭০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে এপিএম। সরকার থেকে কোনো অর্থায়ন বা গ্যারান্টি প্রদান করা হচ্ছে না।
চুক্তির মেয়াদ ৩০ বছর, ভারতে ৬০, চীনে ৫০ চুক্তির মেয়াদ ৩০ বছর হওয়া নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, সেটিকে ‘পিপিপি কাঠামোর ক্ষেত্রে একটি মাঝামাঝি (mid-range) মেয়াদকাল’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা হয়, ভারতে (মুম্বাই পোর্ট, ২০১৮) একই ধরনের চুক্তির মেয়াদ ৬০ বছর এবং ভিয়েতনামে (কাই মেপ পোর্ট, ২০১০) ও চীনে (সাংহাই পোর্ট, ২০০৩) ৫০ বছর।
চুক্তি কেন প্রকাশ করা হচ্ছে না? সরকারি ক্রয়নীতি ও পিপিপি গাইডলাইন অনুযায়ী, চুক্তির মূল দলিল জনসম্মুখে প্রকাশ করাকে ‘নিরাপদ নয়’ বলে জানানো হয়েছে। কারণ এতে ব্যবসায়িক গোপনীয় তথ্য ও অপারেশনাল কৌশল থাকে। সম্পূর্ণ চুক্তি প্রকাশ করলে আগামীতে যেকোনো দর কষাকষিতে বাংলাদেশ ‘ব্যাকফুটে’ চলে যাবে। বিশ্বব্যাংক বা এডিবি-ও চুক্তি প্রকাশের বদলে সারাংশ প্রকাশের পরামর্শ দেয়, যা ইতোমধ্যে প্রেস ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে করা হয়েছে।
কেন এপিএম টার্মিনালস? এপিএম টার্মিনালস হলো বিশ্বখ্যাত ‘এপি মোলার-মেয়ার্স্ক’ গ্রুপের প্রতিষ্ঠান। তারা বিশ্বের শীর্ষ ২০টি বন্দরের ১০টি এবং ৩৩টি দেশে ৬০টির বেশি টার্মিনাল পরিচালনা করছে। অপারেটর বাছাই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ স্বচ্ছ এবং পিপিপি নীতিমালার জি-টু-জি পদ্ধতিতেই সম্পন্ন হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
দেশের কী লাভ হবে? এই টার্মিনাল চালু হলে বন্দরের বর্তমান সক্ষমতা ৪৪% (অতিরিক্ত ৮ লক্ষ TEU) বৃদ্ধি পাবে, পণ্য পরিবহনের খরচ কমবে, দ্বিগুণ বড় জাহাজ ভিড়তে পারবে এবং শত শত স্থানীয় কর্মসংস্থান তৈরি হবে। এটি হবে দেশের প্রথম পরিবেশবান্ধব ‘গ্রীন পোর্ট’।
‘হাউকাউ’ করছে তিন গ্রুপ তাহলে কেন এত সমালোচনা? জবাবে তিনটি গ্রুপকে চিহ্নিত করা হয়েছে: ১. ‘বিশেষ অজ্ঞ’: যারা না পড়েই ‘দেশ ধ্বংস’, ‘দেশ বিক্রি’ বলে ‘ভিউ ব্যবসা’ করেন। ২. দুর্নীতিবাজ: যারা বন্দর থেকে চাঁদা তুলতেন, এখন তাদের স্বার্থে আঘাত লেগেছে। ৩. আরেকদল: (যাদের কথা সবাই জানে)।






















