দীর্ঘ বিরতির পর বাংলাদেশের কনজ্যুমার ডিভাইস বাজারে অফিশিয়ালি ফিরতে যাওয়া বৈশ্বিক প্রযুক্তি জায়ান্ট হুয়াওয়ে (Huawei) কেবল পণ্য আমদানির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। দেশের বাজারে নিজেদের টেকসই অবস্থান তৈরি করতে এবং প্রিমিয়াম ও আপার মিড-রেঞ্জ স্মার্টফোন বাজার দখলে নিতে একটি সুদূরপ্রসারী মাস্টারপ্ল্যান নিয়ে মাঠে নামছে প্রতিষ্ঠানটি। গুগলের বিকল্প শক্তিশালী নিজস্ব ইকোসিস্টেম এবং ভবিষ্যতে বাংলাদেশে স্থানীয়ভাবে কারখানা স্থাপন বা ডিভাইস সংযোজনের (Local Assembly) মতো বড় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা রয়েছে তাদের এই তালিকায়।
হুয়াওয়ের অভ্যন্তরীণ সূত্র ও কর্মকর্তাদের বরাতে কোম্পানির বাজারজাতকরণ কৌশল এবং প্রোডাক্ট পোর্টফোলিও’র বিস্তারিত বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলো:
স্মার্টফোন থেকে ইকোসিস্টেম: প্রাথমিক প্রোডাক্ট পোর্টফোলিও
কোম্পানির কর্মকর্তারা জানান, হুয়াওয়ের তাৎক্ষণিক লক্ষ্য হলো বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান প্রিমিয়াম এবং মাঝারি বাজেটের (মিড-রেঞ্জ) স্মার্টফোন বাজার ধরা। এখানকার গ্রাহকেরা এখন দিন দিন উন্নত ক্যামেরা প্রযুক্তি, প্রোডাক্টিভিটি ফিচার ও এআই (AI)-চালিত কার্যক্ষমতার দিকে ঝুঁকছেন।
এই চাহিদা মেটাতে স্মার্টফোনের পাশাপাশি কোম্পানিটি তাদের জনপ্রিয় মেটপ্যাড ট্যাবলেট, স্মার্টওয়াচ, ফিটনেস ট্র্যাকার ও অডিও অ্যাকসেসরিজসহ বেশ কিছু পণ্য বাজারে আনবে। প্রাথমিক প্রোডাক্ট পোর্টফোলিওতে থাকছে:
ফ্ল্যাগশিপ ও স্মার্টফোন: আল্ট্রা-প্রিমিয়াম ‘হুয়াওয়ে মেট ৮০ প্রো’, ‘হুয়াওয়ে মেট এক্স৭’ ফোল্ডেবল স্মার্টফোন এবং আপার মিড-রেঞ্জের ‘হুয়াওয়ে নোভা ১৫ ম্যাক্স’।
ট্যাবলেট ও ওয়্যারেবলস: প্রোডাক্টিভিটি ফিচারসমৃদ্ধ ‘হুয়াওয়ে মেটপ্যাড ১১.৫’ ট্যাবলেট এবং ‘হুয়াওয়ে ওয়াচ ফিট ৫’ সিরিজ।
অডিও ডিভাইস: উন্নত সাউন্ড কোয়ালিটির ‘হুয়াওয়ে ফ্রিবাডস’ ওয়্যারলেস ইয়ারবাডস ও ইউনিক ওপেন-ইয়ার ডিজাইনের ‘হুয়াওয়ে ফ্রিক্লিপ’।
গুগল ছাড়া নির্বিঘ্ন সেবা: শক্তিশালী অ্যাপগ্যালারি ও এইচএমএস
হুয়াওয়ের ডিভাইসে গুগলের প্রথাগত ইকোসিস্টেমের (GMS) অনুপস্থিতি নিয়ে গ্রাহকদের যে সংশয় ছিল, তা কাটাতে সম্পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়েছে কোম্পানিটি। গুগলের ওপর নির্ভর না করেই গ্রাহকদের নির্বিঘ্ন সেবা দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে তৈরি হয়েছে হুয়াওয়ের সর্বাধুনিক ডিভাইসগুলো।
কোম্পানিটির তথ্যমতে, তাদের নিজস্ব ‘অ্যাপগ্যালারি’ (AppGallery) বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম অ্যাপ মার্কেটপ্লেসে পরিণত হয়েছে। একইসঙ্গে ‘হুয়াওয়ে মোবাইল সার্ভিসেস’ (HMS) বিশ্বজুড়ে গ্রাহকদের ব্যবহৃত বিপুলসংখ্যক অ্যাপ্লিকেশন সফলভাবে সাপোর্ট করছে। হুয়াওয়ের কর্মকর্তারা অ্যাপের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করে জানান:
“আমাদের অ্যাপগ্যালারিতে এখন হোয়াটসঅ্যাপ, বিভিন্ন মেসেজিং অ্যাপ্লিকেশন, ইমেইল সার্ভিসসহ প্রয়োজনীয় সব ধরনের অ্যাপ ব্যবহারের সুবিধা আছে। এছাড়া আমাদের নিজস্ব ব্রাউজার আছে। পাশাপাশি ব্যবহারকারীরা আগে গুগল স্টোর থেকে যেসব অ্যাপ্লিকেশন ডাউনলোড করতেন, সেগুলো ব্যবহারের জন্য আমাদের বিকল্প ব্যবস্থাও রয়েছে।”
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো আরও জানায়, দেশীয় বা স্থানীয় অ্যাপ্লিকেশন এবং যেগুলো এখনো অ্যাপগ্যালারিতে সরাসরি পাওয়া যাচ্ছে না, সেগুলো থার্ড-পার্টি বিকল্প অ্যাপ স্টোরের মাধ্যমে অনায়াসেই ডাউনলোড ও ব্যবহার করা যাবে।
ভবিষ্যতে বাংলাদেশে কারখানা স্থাপনের সম্ভাবনা
আপাতত অফিশিয়াল বিক্রয় চ্যানেলের মাধ্যমে ব্র্যান্ডের উপস্থিতি পুনর্গঠন ও গ্রাহকদের আস্থা অর্জনের ওপর জোর দেওয়া হলেও, ভবিষ্যতে বাংলাদেশে স্থানীয়ভাবে ডিভাইস সংযোজন বা ম্যানুফ্যাকচারিং করার সম্ভাবনা গুরুত্বের সাথে যাচাই করছে হুয়াওয়ে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের পদক্ষেপ দেশীয় ইলেকট্রনিকস উৎপাদন ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারের প্রচেষ্টার সঙ্গে সম্পূর্ণ সংগতিপূর্ণ হবে। এর ফলে হুয়াওয়ে উচ্চ আমদানি শুল্কের হাত থেকে বেঁচে উৎপাদন ব্যয় অনেকটাই কমিয়ে আনতে পারবে, যা স্থানীয় বাজারে তাদের পণ্যের মূল্য হ্রাস করে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।
টেলিকম ও এন্টারপ্রাইজের ব্যাকগ্রাউন্ডই মূল শক্তি
গত কয়েক বছর ধরে সাধারণ গ্রাহকদের জন্য কনজ্যুমার ডিভাইস (স্মার্টফোন ও গ্যাজেট) ব্যবসা মূলত নিষ্ক্রিয় থাকলেও, হুয়াওয়ে কিন্তু বাংলাদেশ থেকে কখনো হারিয়ে যায়নি। তারা তাদের শক্তিশালী ‘এন্টারপ্রাইজ’ ও ‘টেলিকমিউনিকেশন’ কার্যক্রমের মাধ্যমে দেশের আইসিটি খাতে অত্যন্ত মজবুত অবস্থান ধরে রেখেছে।
টেলিকম নেটওয়ার্ক অবকাঠামো নির্মাণ, ক্লাউড সেবা, রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি ডেটা সেন্টার স্থাপন এবং ডিজিটাল রূপান্তর (Digital Transformation) প্রকল্পের ক্ষেত্রে কোম্পানিটি এখনো বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান প্রযুক্তি অংশীদার হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে। করপোরেট ও সরকারি খাতের এই দীর্ঘদিনের সুখ্যাতি এবং শক্তিশালী ভিত্তিই কনজ্যুমার মার্কেটে হুয়াওয়ের অফিশিয়াল প্রত্যাবর্তনকে দ্রুত সফল করতে বড় ব্যাকআপ হিসেবে কাজ করবে।





















