মাধ্যমিক স্তরের ২০২৬ সালের নতুন বই ছাপানোর কাজ পেতে আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট। দরপত্রে অনিয়মের অভিযোগে সম্প্রতি সরকার তিনটি শ্রেণির বই ছাপানোর ক্রয়াদেশ বাতিল করে এবং সিন্ডিকেট ভাঙতে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানের নিয়ম চালু করে। কিন্তু সেই আইনকে পাশ কাটিয়ে, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) কিছু আওয়ামীপন্থী কর্মকর্তার যোগসাজশে পুরোনো নিয়মেই বিতর্কিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে কাজ দেওয়ার পাঁয়তারা চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সূত্র জানিয়েছে, এই সিন্ডিকেটকে সুবিধা দিতে কাগজের মান সংক্রান্ত শর্ত শিথিল করা হচ্ছে এবং প্রেস মালিকদের আন্দোলনের ভয় দেখিয়ে শিক্ষা উপদেষ্টাকে পুরোনো নিয়মে দরপত্র আহ্বানে রাজি করানোর চেষ্টা চলছে। আজ (রবিবার) থেকে ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির বইয়ের দরপত্র পুরোনো নিয়মেই পুনরায় উন্মুক্ত করা হবে।
কাগজের মান কমানোর পাঁয়তারা
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সূত্র অনুযায়ী, বই ছাপানোর কাগজের স্পেসিফিকেশনে গোপনে পরিবর্তন আনা হচ্ছে। যেখানে কাগজের মান নির্ধারণী ‘ব্রাস্টিং ফ্যাক্টর’ ২০ করা হয়েছিল, সেখানে পুনরায় দরপত্র আহ্বানের সময় তা কমিয়ে ১৮-তে নামিয়ে আনা হচ্ছে। প্রেস মালিকদের সুবিধা দিতেই এনসিটিবি এই উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানা গেছে।
কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে যোগসাজশের অভিযোগ
এনসিটিবির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা আওয়ামীপন্থী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এই সিন্ডিকেটকে সহায়তার অভিযোগ উঠেছে।
চেয়ারম্যানের পদ: চলতি বছরের শুরু থেকে এনসিটিবির চেয়ারম্যানের পদ শূন্য। এই পদে নতুন নিয়োগ না দিয়ে আওয়ামীপন্থী এবং সাবেক ছাত্রলীগ নেতা হিসেবে পরিচিত এক কর্মকর্তাকে রুটিন দায়িত্ব দেওয়া হয়। সম্প্রতি তার অবসরের সময় হলেও, তাকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় কাজ করছে।
সদস্য (পাঠ্যপুস্তক): এনসিটিবির সদস্য অধ্যাপক ড. রিয়াদ চৌধুরী, যিনি সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনির সময় নানা অনিয়মের মাধ্যমে সুবিধা নিয়েছেন বলে অভিযোগ, তিনিও বর্তমানে চেয়ারম্যান পদের জন্য তদবির করছেন।
উপদেষ্টার পিএস: শিক্ষা উপদেষ্টার ব্যক্তিগত কর্মকর্তা (পিএস) একেএম তাজকির-উজ-জামানের বিরুদ্ধে কারিকুলামে ৭ মার্চের ভাষণ অন্তর্ভুক্ত করা সহ এনসিটিবির বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ভূমিকার অভিযোগ উঠেছে।
নিম্নমানের বই দিয়েও পার পেয়ে গেছে সিন্ডিকেট
চলতি বছর এই সিন্ডিকেটের অন্তর্ভুক্ত এক শ্রেণির মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থীদের প্রায় ৩০ শতাংশ নিম্নমানের বই সরবরাহ করেছিল, যা শিক্ষার্থীদের চোখের সমস্যাসহ নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। এনসিটিবি সারা দেশ থেকে বইয়ের নমুনা সংগ্রহ করে অভিযুক্তদের তালিকা তৈরি করলেও, সেই রিপোর্ট মন্ত্রণালয়ে না পাঠিয়ে গোপন করে রেখেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
এনসিটিবির সচিব অধ্যাপক মো. সাহতাব উদ্দিন এ বিষয়ে বলেন, নিম্নমানের বইয়ের তালিকা চেয়ারম্যান মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছেন কি না, তা তিনি ভালো বলতে পারবেন।
দরপত্র নিয়ন্ত্রণে গোপন বৈঠক
আজ থেকে তিন শ্রেণির দরপত্র উন্মুক্ত হওয়ায়, গত কয়েকদিন ধরে দুলাল সরকার, রুবেল, মহসিন ও মিন্টু মোল্লাসহ সিন্ডিকেটের সদস্যরা বিভিন্ন হোটেলে গোপন বৈঠক করেছেন। দরপত্রের নিয়ন্ত্রণ নিতে তারা অন্য অনেক প্রেস মালিকের আইডি ও পাসওয়ার্ড হাতিয়ে নিয়েছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
এদিকে, আজ ক্রয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা কমিটির সভায় নবম ও দশম শ্রেণির বইয়ের দরপত্র অনুমোদনের জন্য তোলা হলেও, সেই দরপত্রেও অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় বেশির ভাগ মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান তা বাতিলের দাবি জানিয়েছে।






















