ফুসফুসের ক্যান্সার শনাক্তে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহার করে বড় সাফল্য পেয়েছে ভারত। দেশটির দক্ষিণপশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় রাজ্য গোয়ায় সরকারি হাসপাতালগুলোতে এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রাথমিক পর্যায়েই (স্টেজে) ফুসফুসের ক্যান্সার শনাক্ত করা গেছে।
উল্লেখ্য, ফুসফুসের ক্যান্সারের সবচেয়ে বড় বিপদ হলো এর উপসর্গহীনতা। সাধারণত তৃতীয় (স্টেজ-৩) বা চতুর্থ (স্টেজ-৪) পর্যায়ে যাওয়ার আগে রোগটি শনাক্তই করা যায় না। ফলে যখন শনাক্ত হয়, তখন রোগীর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা নেমে আসে ১৫ শতাংশের নিচে। এখানেই বাজিমাৎ করে দেখিয়েছে গোয়ার হাসপাতালগুলো।
সাধারণত ফুসফুসের ক্যান্সার শনাক্ত করতে দামী ‘লো-ডোজ সিটি স্ক্যান’ করতে হয়, যা যথেষ্ট ব্যয়সাপেক্ষ এবং সব হাসপাতালে সহজলভ্য নয়। ফলে এটি সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। গোয়া সরকার এই সমস্যার সমাধান করেছে এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে। স্বাস্থ্য-প্রযুক্তি সংস্থা ‘কিউরে ডট এআই’ এবং ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান অ্যাস্ট্রাজেনেকার সহায়তায় তারা সরকারি হাসপাতালগুলোতে বিশেষ এআই সার্ভার বসিয়েছে।
এখন কোনো রোগী জ্বর, ইনফেকশন বা অস্ত্রোপচারের আগে যখন সাধারণ এক্স-রে করাচ্ছেন, এআই সফটওয়্যারটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেই ছবি বিশ্লেষণ করে দেখছে সেখানে কোনো ‘পালমোনারি নডিউল’ বা ছোট টিউমারের অস্তিত্ব আছে কি না।
বিগত কয়েক মাসে গোয়ার ১৮টি সরকারি হাসপাতালে প্রায় ১ লক্ষ মানুষের স্ক্রিনিং করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৬’শ জনের মেডিকেল রিপোর্টে সন্দেহজনক কিছু পাওয়া যায় এবং ২০ জনের শরীরে প্রাথমিক পর্যায়ের ফুসফুসের ক্যান্সার নিশ্চিত করা হয়েছে। সময়মতো রোগ ধরা পড়ায় এদের সুস্থ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা এখন অনেক বেশি।
ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে চলমান ‘ইন্ডিয়া এআই ইমপ্যাক্ট সামিট ২০২৬’-এ এই সাফল্যের কথা তুলে ধরা হয়েছে। গোয়ার এই সাফল্য দেখে এখন মহারাষ্ট্র, কর্নাটক, তামিলনাড়ু ও ওড়িশার মতো রাজ্যগুলোও এই প্রযুক্তি ব্যবহারের কথা ভাবছে। এমনকি ভারত সরকার এবং ন্যাশনাল হেলথ অথরিটি (এনএইচএ) পুরো দেশজুড়ে এই মডেল চালুর বিষয়ে আলোচনা শুরু করেছে।
উল্লেখ্য, গ্লোবোক্যান ২০২২-এর তথ্য অনুযায়ী, ভারতে ক্যান্সারজনিত মৃত্যুর চতুর্থ প্রধান কারণ হলো ফুসফুসের ক্যানসার। ২০২২ সালে দেশটিতে ৮০ হাজারেরও বেশি নতুন রোগী শনাক্ত করা হয়েছে এবং প্রায় ৭৫ হাজার মানুষ মারা গেছে। এক সময় মনে করা হতো এটি কেবল ধূমপায়ীদের রোগ, কিন্তু বর্তমানে বায়ুদূষণের কারণে বিপুল সংখ্যক অধূমপায়ী এবং নারীরাও এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এটি খরচ কমায় এবং যেখানে বিশেষজ্ঞ রেডিওলজিস্টের অভাব রয়েছে, সেখানে এটি সিদ্ধান্ত নিতে চিকিৎসকদের সাহায্য করে। ল্যানসেট-এর এক গবেষণাও বলছে, স্তন ক্যান্সার বা ফুসফুসের ক্যান্সার শনাক্তকরণে এআই প্রযুক্তির সাফল্যের হার অবিশ্বাস্যভাবে বেশি।
বাংলাদেশেও বায়ুদূষণ এবং তামাকজাত পণ্যের ব্যবহারে ফুসফুসের রোগীর সংখ্যা ক্রমবর্ধমান। বিশেষ করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের প্রধান প্রধান শহরগুলোর বায়ুর মান আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। এই প্রেক্ষাপটে স্তন ও ফুসফুসের ক্যান্সার প্রাথমিক স্তরে শনাক্ত করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির ব্যবহারের বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করতে পারে বাংলাদেশও।






















