চোরাই, ক্লোন কিংবা শুল্ক ফাঁকি দিয়ে আনা মোবাইল ফোন বিক্রির ‘আইনি অধিকার’ দিতে হবে—এমন অদ্ভুত দাবিতে আন্দোলন সম্ভবত বাংলাদেশেই সম্ভব। আর এই দাবির পক্ষে সাফাই গাইছেন এক শ্রেণির মোবাইল ব্যবসায়ী এবং নীতি-নৈতিকতার জ্ঞান দেওয়া কিছু সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার।
বিশ্লেষকরা বলছেন, উচ্চ করহার কমানোর দাবি যৌক্তিক হতে পারে, কিন্তু সেই অজুহাতে চোরাচালানকে বৈধতা দেওয়ার দাবি কোনো সভ্য সমাজে চলতে পারে না।
দেশের মোবাইল বাজারের বর্তমান চিত্র ভয়াবহ। বিটিআরসির সাম্প্রতিক ডাটাবেজ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে:
-
আইফোন: দেশের চার অপারেটরের নেটওয়ার্কে সচল ১৯ লাখ ৭৬ হাজার আইফোনের মধ্যে ১৯ লাখ ৫৫ হাজারই অবৈধ বা বিটিআরসির তালিকায় নেই। অর্থাৎ প্রায় ৯৯ শতাংশ আইফোনই চোরাই বা অবৈধ পথে এসেছে।
-
স্যামসাং: দেশে সচল ২ কোটি ৩১ লাখ ২৯ হাজার স্যামসাং ফোনের মধ্যে ১ কোটি ৪৯ লাখ ২৬ হাজারই অবৈধ।
-
ভুয়া আইএমইআই: মাত্র ১০টি আইএমইআই (IMEI) নম্বরের বিপরীতে চলছে প্রায় ৫০ লাখ মোবাইল ফোন!
‘গ্রে মার্কেট’ নাকি চুরির কারবার? ব্যবসায়ীরা দাবি করছেন, সরকার মোবাইল আমদানিতে ৩৫ থেকে ৫৪ শতাংশ ট্যাক্স বসিয়েছে, তাই তারা ‘লাগেজ পার্টি’র মাধ্যমে ফোন এনে কম দামে বিক্রি করছেন। শোরুমে যে ফোনের দাম ৩০ হাজার টাকা, বসুন্ধরা বা ইস্টার্ন প্লাজার নন-ব্র্যান্ড দোকানে তা ২০ হাজার টাকায় পাওয়া যাচ্ছে।
তারা এই অবৈধ প্রক্রিয়ার নাম দিয়েছেন ‘গ্রে-মার্কেট’। কিন্তু অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ট্যাক্স ফাঁকি দিয়ে আনা পণ্য বিক্রি করা সোজা কথায় ‘চোরাকারবার’। ট্যাক্স কমানোর দাবিতে আন্দোলন না করে, তারা অবৈধ পণ্য বিক্রির অধিকার চাইছেন, যা আইনের শাসনের পরিপন্থী।
সরকার ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (এনইআইআর) পদ্ধতি পুরোপুরি চালু করতে যাচ্ছে। এর ফলে:
১. ১৬ ডিসেম্বরের আগে চালু থাকা কোনো পুরনো ফোন বন্ধ হবে না।
২. ১৬ ডিসেম্বরের পর বিদেশ থেকে আনা বা কেনা ফোন বৈধ না হলে তা নেটওয়ার্কে কাজ করবে না।
কিন্তু অবৈধ ব্যবসায়ীরা দাবি করছেন, তাদের কাছে মজুদ থাকা অবৈধ ফোন বিক্রির জন্য আরও এক বছর সময় দিতে হবে। তারা এনইআইআর-কে ‘সিন্ডিকেট’ বলে আখ্যা দিচ্ছেন। অথচ এনইআইআর চালু হলে বৈধ আমদানির সুযোগ সবার জন্যই উন্মুক্ত থাকবে, এখানে সিন্ডিকেট হওয়ার সুযোগ নেই। যদি তারা ব্যাগেজ রুল মেনেই ফোন আনেন, তবে আইএমইআই দিয়ে নিবন্ধন করতে তাদের আপত্তি কেন—সেই প্রশ্ন তুলছেন বিশেষজ্ঞরা।
অবৈধ এই ব্যবসাকে টিকিয়ে রাখতে মাঠে নেমেছেন কিছু ইনফ্লুয়েন্সার। তারা নিজেদের বিশাল ভক্তকুলকে ব্যবহার করে সরকারের এই উদ্যোগের বিরুদ্ধে জনমত তৈরির চেষ্টা করছেন। অভিযোগ উঠেছে, এর বিনিময়ে তারা বড় অঙ্কের আর্থিক সুবিধা পাচ্ছেন।
সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধি, জাতীয় নিরাপত্তা এবং দেশীয় মোবাইল শিল্পকে বাঁচাতে এনইআইআর বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নেই। ট্যাক্স কমানোর বিষয়টি বিবেচনার দাবি রাখে, কিন্তু তার দোহাই দিয়ে ‘চুরির মাল’ বিক্রির লাইসেন্স দাবি করা রাষ্ট্রের আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শনের শামিল।






















