দুই দেশের কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় তেমন জোর আছে বলে মনে হচ্ছে না। ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য সামরিক সংঘাতের দিকে এগোচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র – এমনই মত বিশ্লেষকদের। তেহরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা ভেস্তে যেতে বসেছে। দ্য নিউইয়র্ক টাইমস ও বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সীমিত হামলা থেকে শুরু করে বড় ধরনের সামরিক পদক্ষেপ — বিভিন্ন বিকল্প বিবেচনা করছেন। এসবের মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যে বড় পরিসরে মার্কিন সামরিক মোতায়েন চলছে।
জানুয়ারিতে ট্রাম্প বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের একটি ‘আর্মাদা’ বা নৌবহর ইরানের দিকে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিকে ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের ঝটিকা অভিযানের সঙ্গে তুলনা করে তিনি বলেছিলেন, মিশন ‘দ্রুততা ও শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে’ সম্পন্ন করা সম্ভব।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, ইরান ভেনেজুয়েলার তুলনায় অনেক বেশি জটিল চ্যালেঞ্জ। দেশটির সামরিক সক্ষমতা গভীর। আঞ্চলিক যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও বেশি।
কী কী কারণে ইরানে হামলা করলে উল্টো যুক্তরাষ্ট্রই বিপাকে পড়তে পারে, এ নিয়ে বিশ্লেষণ করেছে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস।
‘পরিষ্কার’ কোনো সামরিক বিকল্প নেই
বিশ্লেষকদের সতর্কবার্তা তুলে ধরে দ্য নিউইয়র্ক টাইমস জানায়, ইরানের ক্ষেত্রে ‘কম খরচে, সহজ, পরিষ্কার সামরিক বিকল্প’ নেই। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের আলি ভাইজ পত্রিকাটিকে বলেন, মার্কিন হতাহতের ‘বাস্তব ঝুঁকি’ রয়েছে। নির্বাচনের বছরে এই বিষয়টি ট্রাম্পের জন্য বড় বিবেচ্য হতে পারে।
ইরানের কাছে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম বৃহৎ ও বৈচিত্র্যময় ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার রয়েছে। এর মধ্যে ১,২০০ মাইলের বেশি পাল্লার মাঝারি পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রও আছে। ফলে উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটি, ইসরায়েল, এমনকি তুরস্কের কিছু অংশও এর আওতায় পড়ে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম সম্প্রতি জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে মহড়ার সময় ৯৩ মাইলের বেশি পাল্লার একটি সমুদ্রভিত্তিক আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা করা হয়েছে।
চ্যাথাম হাউসের সানাম ভাকিল টাইমসকে বলেন, তেহরানের কৌশল হলো দ্রুত উত্তেজনা বাড়ানো এবং একাধিক অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা ছড়িয়ে দেওয়া। এতে সংঘাতের মূল্য ও চাপ ছড়িয়ে পড়ে।
প্রক্সি নেটওয়ার্ক ও আঞ্চলিক প্রভাব
ইরানের তথাকথিত ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। এই অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্সের মধ্যে লেবাননে হিজবুল্লাহ ও ইয়েমেনে হুথিরাও আছে। এই গোষ্ঠীগুলোর কয়েকটি আগের চেয়ে দুর্বল হয়ে গেলেও তারা পাল্টা আঘাত হানার সক্ষমতা ধরে রেখেছে। এসব সংগঠনের উপস্থিতি বোঝায়, ইরানে হামলার ক্ষেত্রে একাধিক ফ্রন্ট খুলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
ইরানপন্থী অন্তত একটি ইরাকি গোষ্ঠী জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালালে তারা তেহরানকে সমর্থন দেবে। তারা সম্ভাব্য ‘শহীদি অভিযানের’ হুঁশিয়ারিও দিয়েছে। হুথিরা আবার লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজ লক্ষ্য করে হামলা শুরু করতে পারে। ২০২৩ সালের শেষ দিকে তারা এমন হামলা চালিয়েছিল।
মার্কিন ঘাঁটি থাকা উপসাগরীয় দেশগুলোও সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত জানুয়ারিতে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জন্য তারা নিজেদের আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি দেবে না। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এতে ইরানের প্রতিশোধ থেকে পুরোপুরি রক্ষা পাওয়া নিশ্চিত নয়।
কূটনীতির আশা ক্ষীণ
রয়টার্সের পৃথক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, কূটনৈতিক সমাধানের আশা ক্রমেই কমছে। ২০০৩ সালে ইরাক আগ্রাসনের পর এবারই মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামরিক মোতায়েন দেখা যাচ্ছে।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের দুই দফা আলোচনা থমকে গেছে। ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার — এসব ইস্যুতে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। রয়টার্স জানায়, ক্ষেপণাস্ত্র–সংক্রান্ত মার্কিন প্রস্তাব খুলতেই অস্বীকৃতি জানিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। তিনি প্রস্তাবটি না খুলেই ফেরত দেন।
ইরান পাল্টা প্রস্তাব দেওয়ার প্রস্তুতি নিলেও ট্রাম্প সতর্ক করেছেন, চুক্তি না হলে ‘খুব খারাপ কিছু’ ঘটতে পারে। তিনি স্বীকার করেছেন, সমাধানের জন্য চাপ সৃষ্টি করতে সীমিত হামলার কথাও বিবেচনায় আছে।
রয়টার্সের বরাত দিয়ে মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সম্ভাব্য পদক্ষেপের সময় এখনো অনিশ্চিত। পূর্ণ সামরিক মোতায়েন মার্চের মাঝামাঝি নাগাদ সম্পন্ন হতে পারে।
চূড়ান্ত লক্ষ্য কী
রয়টার্স জানায়, ইউরোপীয় ও আঞ্চলিক কর্মকর্তারা ওয়াশিংটনের চূড়ান্ত লক্ষ্য নিয়ে নিশ্চিত নন। হামলার উদ্দেশ্য কি পরমাণু ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা দুর্বল করা, উত্তেজনা ঠেকানো, নাকি শাসন পরিবর্তন — তা স্পষ্ট নয়।
ইরানের রাজনৈতিক কাঠামো এই প্রশ্নকে আরও জটিল করে তোলে। ভেনেজুয়েলায় দ্রুত অভিযানে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু ইরানের ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার কেন্দ্রে রয়েছেন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। তাঁকে ঘিরে শক্ত অবস্থানে আছে আইআরজিসি।
বিশ্লেষকদের সতর্কতা, সামরিক পদক্ষেপ শাসন পরিবর্তন ঘটাবে — এমন ধারণা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
হরমুজ প্রণালি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এই পথ দিয়ে যায়। ইরান আগেও এই প্রণালি বন্ধের হুমকি দিয়েছে। এমন পরিস্থিতি জ্বালানি দামে বড় উল্লম্ফন ঘটাতে পারে।
এতে ইরানের নিজস্ব রপ্তানিও ক্ষতিগ্রস্ত হবে ঠিকই, তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামান্য বিঘ্নও বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
দুই পক্ষই নিজেদের ‘রেড লাইন’ ধরে রাখায় হিসাবে কোনো একটা ভুল করে বসার ঝুঁকি বাড়ছে। ওয়াশিংটন শূন্য সমৃদ্ধকরণ চায়। তেহরান জোর দিচ্ছে সার্বভৌম পরমাণু অধিকারের ওপর। রয়টার্স সাবেক মার্কিন কূটনীতিক অ্যালান আইরের বক্তব্য উদ্ধৃত করে জানায়, উভয় পক্ষ অবস্থান না বদলালে অগ্রগতি কঠিন। তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেছেন, এমন সমঝোতা আদৌ হবে কি না।
সামরিক প্রস্তুতি ও কঠোর বক্তব্যের এই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র – ইরান অচলাবস্থা এক সিদ্ধান্তমূলক পর্যায়ে ঢুকছে। যেখানে উত্তেজনার মূল্য যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরেও অনেক দূর পর্যন্ত গড়াতে পারে।


















