তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার বহুল প্রতীক্ষিত আলোচনা কোনো চুক্তি ছাড়াই বৃহস্পতিবার শেষ হয়েছে। এমন এক সময়ে এই আলোচনা নিষ্ফল হলো, যখন হোয়াইট হাউস মধ্যপ্রাচ্যে গত কয়েক দশকের মধ্যে তাদের সবচেয়ে বড় সামরিক অভিযানের কথা বিবেচনা করছে। খবর দ্য গার্ডিয়ানের।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি দাবি করেছেন, এ আলোচনায় ‘ভালো অগ্রগতি’ হয়েছে। অন্যদিকে, মধ্যস্থতাকারী ওমানের ধারণা, আগামী সপ্তাহে ভিয়েনায় প্রযুক্তিগত পর্যায়ে পুনরায় আলোচনা শুরু হবে। তবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে ইরানের অধিকার এবং তাদের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুতের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুই পক্ষ কাছাকাছি কোনো অবস্থানে পৌঁছাতে পেরেছে-এমন কোনো সুস্পষ্ট প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি।
জেনেভায় দুই ধাপে এই পরোক্ষ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। মধ্যপ্রাচ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের নেতৃত্বাধীন মার্কিন দল ইরানের প্রস্তাবে হতাশ হয়েছে বলে জানা গেছে।
দ্বিতীয় ধাপের আলোচনাটি খুব দ্রুত শেষ হয়ে যাওয়াকে পর্যবেক্ষকরা অশনিসংকেত হিসেবে দেখছেন। আলোচনার একপর্যায়ে উইটকফকে ইউক্রেনীয় আলোচকদের সঙ্গে দেখা করার জন্য আরাগচির সঙ্গে বৈঠক সাময়িকভাবে স্থগিত করতে হয়, যা তেহরানের প্রতিনিধি দলকে হতাশ করে।
যুক্তরাষ্ট্র চাইছে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ও পরিদর্শনের বিষয়ে ইরান স্থায়ী নিশ্চয়তা দিক, যাতে ওয়াশিংটন নিশ্চিত হতে পারে যে, তেহরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে পারবে না। অবশ্য ইরান বরাবরই এমন উদ্দেশ্য থাকার কথা অস্বীকার করে আসছে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করতে ইরানের অস্বীকৃতি একটি বড় সমস্যা। জবাবে মার্কিন দাবির অসংগতি নিয়ে অভিযোগ করেছেন ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই।
এই আলোচনা এমন এক প্রেক্ষাপটে হচ্ছে, যখন ওই অঞ্চলে ডোনাল্ড ট্রাম্প নজিরবিহীন সামরিক সমাবেশ ঘটিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে দুটি বিমানবাহী রণতরী, অ্যাটাক এয়ারক্রাফট এবং টোমাহক মিসাইল সজ্জিত সাবমেরিন।
আলোচনার মূল বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্র তেহরানকে প্রায় সব ধরনের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ থেকে পুরোপুরি বিরত রাখতে চাইছে। গত জুনে মার্কিন বোমা হামলায় ইরানের ফোর্ডো, নাতাঞ্জ ও ইস্পাহানের তিনটি প্রধান পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংস হয়ে গেছে বলে ট্রাম্প দাবি করার পর ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ নিয়ে বিবাদের কিছু অংশ হয়তো স্থগিত রাখা যেতে পারে। তবে ওই মার্কিন হামলার পর থেকে জাতিসংঘের পরমাণু তদারকি সংস্থা আইএইএ-কে (ওঅঊঅ) ওই স্থাপনাগুলোর ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা পরিদর্শনের অনুমতি দেয়নি তেহরান।
যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, এ তিনটি স্থাপনা স্থায়ীভাবে ভেঙে ফেলতে হবে। কিন্তু এর সঙ্গে ইরানের প্রস্তাবের বিরোধ রয়েছে। তেহরানের প্রস্তাব হলো, তিন থেকে পাঁচ বছর পর জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে নিম্নমাত্রার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অনুমতি দিতে হবে।
অপর একটি বড় অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে ইরানের ৬০ শতাংশ বিশুদ্ধতায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত নিয়ে, যা প্রায় পারমাণবিক অস্ত্রের উপযোগী। আইএইএ-এর মতে, তেহরান এখনো ৪০০ কেজি ইউরেনিয়ামের মজুতের অবস্থান নিশ্চিত করেনি, যা দিয়ে ১৯৪৫ সালে নাগাসাকিতে ফেলা বোমার মতো পাঁচ থেকে ছয়টি বোমা তৈরি করা সম্ভব।
যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক হুমকির মুখে দেশের ভেতরেও চাপে আছেন ট্রাম্প। ডেমোক্র্যাটরা তার এই পদক্ষেপের বিষয়ে কংগ্রেসে ভোটাভুটির দাবি জানিয়েছেন। চলতি সপ্তাহে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) এক জরিপে দেখা গেছে, ৫৬ শতাংশ মার্কিন নাগরিক দেশের বাইরে সামরিক শক্তি প্রয়োগের বিষয়ে ট্রাম্পের সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ওপর আস্থা রাখেন না।
অন্যদিকে, ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, তারা পারমাণবিক বিষয়ের বাইরে অন্য কোনো ইস্যুতে আলোচনা করবে না। ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বা মধ্যপ্রাচ্যের ‘প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলোকে’ সমর্থনের মতো বিষয়গুলো আলোচনার টেবিলে তুলতে তারা অস্বীকৃতি জানিয়েছে।




















