ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দফায় দফায় একাধিক পারমাণবিক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে এ আলোচনায় অন্যতম বিতর্কিত বিষয় হয়ে উঠেছে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বার বার ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ইস্যুতে আলোচনা করতে চাইলেও, ইরান এ বিষয়ে কোনো আগ্রহ দেখাচ্ছে না।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বৃহস্পতিবার বলেছেন, ইরান ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে আলোচনা করতে না চাইলে সেটা হবে বড় সমস্যা।
অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনালাড ট্রাম্প দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রে হামলায় সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্র বানাচ্ছে ইরান।
ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রকে কার্যত ভয়ের চোখেই দেখছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল।
ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কী?
ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হলো রকেটচালিত অস্ত্র, যা উড্ডয়নের প্রাথমিক পর্যায়ে নিয়ন্ত্রিত থাকে, তবে পথের অধিকাংশ সময় মুক্ত-পতন গতিপথ অনুসরণ করে। এটি বিভিন্ন দূরত্বে ওয়ারহেড বহন করে পৌঁছে দেয়—যার মধ্যে প্রচলিত বিস্ফোরক কিংবা সম্ভাব্য জৈব, রাসায়নিক বা পারমাণবিক অস্ত্র থাকতে পারে।
পশ্চিমা শক্তিগুলো ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডারকে মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার জন্য একটি প্রচলিত সামরিক হুমকি হিসেবে দেখে এবং তেহরান যদি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করে, তবে এগুলো সেই অস্ত্র বহনের মাধ্যম হতে পারে বলেও মনে করে। ইরান পারমাণবিক বোমা তৈরির কোনো অভিপ্রায় থাকার কথা অস্বীকার করে।
ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের ধরন ও পাল্লা
যুক্তরাষ্ট্রের ডিরেক্টর অব ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্সের কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে ইরানেরই সবচেয়ে বড় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার রয়েছে। ইরান নিজস্বভাবে দুই হাজার কিলোমিটার পাল্লা নির্ধারণ করেছে, যা তাদের কর্মকর্তাদের মতে দেশ রক্ষার জন্য যথেষ্ট, কারণ এতে ইসরায়েলে পৌঁছানো সম্ভব।
ইরানের বহু ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি তেহরান ও তার আশপাশে অবস্থিত। বিভিন্ন প্রদেশে অন্তত পাঁচটি পরিচিত ভূগর্ভস্থ ‘মিসাইল সিটি’ রয়েছে, যার মধ্যে কেরমানশাহ ও সেমনান, পাশাপাশি উপসাগরীয় অঞ্চলের নিকটবর্তী এলাকাও অন্তর্ভুক্ত।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের তথ্য অনুযায়ী, ইরানের ভাণ্ডারে এমন একাধিক দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে যা ইসরায়েলে পৌঁছাতে সক্ষম। এর মধ্যে রয়েছে সেজিল (২,০০০ কিমি), এমাদ (১,৭০০ কিমি), গদর (২,০০০ কিমি), শাহাব-৩ (১,৩০০ কিমি), খোররামশাহর (২,০০০ কিমি) এবং হোভেইজেহ (১,৩৫০ কিমি)।
আধা-সরকারি ইরানি বার্তা সংস্থা ইসনা ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে প্রকাশিত এক গ্রাফিকে জানায়, অন্তত ৯টি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ইসরায়েলে পৌঁছাতে সক্ষম।
এর মধ্যে সেজিল ঘণ্টায় ১৭ হাজার কিলোমিটারের বেশি গতিতে উড়তে পারে এবং এর পাল্লা আড়াই হাজার কিলোমিটার; খেইবারের পাল্লা দুই হাজার কিলোমিটার; এবং হাজ কাসেমের পাল্লা এক হাজার ৪০০ কিলোমিটার।
ওয়াশিংটনভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক আর্মস কন্ট্রোল অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, ইরানের ব্যালিস্টিক ভাণ্ডারে শাহাব-১ (প্রায় ৩০০ কিমি), জুলফাগার (৭০০ কিমি), শাহাব-৩ (৮০০-১,০০০ কিমি), উন্নয়নাধীন এমাদ-১ (২,০০০ কিমি) এবং উন্নয়নাধীন সেজিল মডেল (১,৫০০-২,৫০০ কিমি) অন্তর্ভুক্ত।
সর্বশেষ কবে ইরান ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে?
২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধে তেহরান ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে, যাতে বহু মানুষ নিহত এবং ভবন ধ্বংস হয়।
ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ার এবং এইইআই ক্রিটিক্যাল থ্রেটস প্রজেক্ট জানায়, ওই সংঘাতে ইসরায়েল সম্ভবত ইরানের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চার ধ্বংস করেছে। ইরানি কর্মকর্তারা বলেন, যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি থেকে তারা পুনরুদ্ধার করেছে।
ইসরায়েলের বিমান হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণের জবাবে ইরান কাতারে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের আল উদেইদ ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। তেহরান আগাম সতর্কবার্তা দিয়েছিল এবং এতে কেউ হতাহত হয়নি। কয়েক ঘণ্টা পর ওয়াশিংটন যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেয়।
২০২৪ সালের জানুয়ারিতে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডস জানায়, তারা ইরাকের আধা-স্বায়ত্তশাসিত কুর্দিস্তান অঞ্চলে ইসরায়েলের গুপ্তচর সদর দপ্তরে হামলা চালিয়েছে এবং সিরিয়ায় ইসলামিক স্টেট জঙ্গিদের লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে।
তেহরান পাকিস্তানে একটি বালুচ সশস্ত্র গোষ্ঠীর দুটি ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কথাও ঘোষণা করে।
২০১৯ সালে সৌদি আরবের তেল স্থাপনায় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পেছনে ইরানের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্র দাবি করলেও তেহরান তা অস্বীকার করে।
২০২০ সালে রেভল্যুশনারি গার্ডসের মেজর জেনারেল কাসেম সোলেইমানিকে হত্যাকারী যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন হামলার প্রতিশোধ হিসেবে ইরান ইরাকে যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন বাহিনীর ওপর ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়।
ক্ষেপণাস্ত্র কৌশল ও উন্নয়ন
ইরান বলছে, তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং অন্যান্য সম্ভাব্য আঞ্চলিক লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ও প্রতিশোধমূলক সক্ষমতা প্রদান করে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিসের জ্যেষ্ঠ গবেষক বেহনাম বেন তালেবলুর ২০২৩ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরান পরিবহন ও নিক্ষেপ ব্যবস্থা-সজ্জিত ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র ডিপো, পাশাপাশি উৎপাদন ও সংরক্ষণ কেন্দ্র উন্নয়ন অব্যাহত রেখেছে। ২০২০ সালে ইরান প্রথমবারের মতো ভূগর্ভ থেকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘বছরের পর বছর ক্ষেপণাস্ত্র রিভার্স-ইঞ্জিনিয়ারিং এবং বিভিন্ন শ্রেণির ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের অভিজ্ঞতা ইরানকে এয়ারফ্রেম দীর্ঘায়িত করা ও হালকা যৌগিক উপাদান ব্যবহার করে পাল্লা বাড়াতে সহায়তা করেছে।’
২০২৩ সালের জুনে ইরান কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী নিজেদের তৈরি প্রথম হাইপারসনিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উন্মোচন করে বলে রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরএনএ জানায়। হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র শব্দের গতির কমপক্ষে পাঁচগুণ গতিতে জটিল গতিপথে উড়তে পারে, যা এগুলোকে প্রতিহত করা কঠিন করে তোলে।
আর্মস কন্ট্রোল অ্যাসোসিয়েশনের মতে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি মূলত উত্তর কোরিয়া ও রাশিয়ার নকশার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে এবং চীনের সহায়তা থেকেও উপকৃত হয়েছে।
ইরানের কাছে খ-৫৫-এর মতো ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রও রয়েছে, যা আকাশ থেকে নিক্ষেপযোগ্য এবং পারমাণবিক ওয়ারহেড বহনে সক্ষম; এর পাল্লা সর্বোচ্চ তিন হাজার কিলোমিটার।




















