কয়েক মাস ধরে দক্ষিণ চীন সাগরের আকাশে চতুর কৌশলে বড় আকারের এক চীনা সামরিক ড্রোন নিয়মিত নজরদারি চালাচ্ছে। পরিচয় গোপন রাখতে ভুয়া সংকেত ব্যবহার করছে ড্রোনটি, যা রেডারে মার্কিন নিষিদ্ধ ঘোষিত বেলারুশের কার্গো প্লেন ও ব্রিটিশ টাইফুন ফাইটার জেট হিসেবে ভ্রম তৈরি করছে।
সামরিক বিশেষজ্ঞ ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের এ তৎপরতা কেবল সাধারণ কোনো মহড়া নয়, বরং ভবিষ্যতে তাইওয়ান দখলের মতো পরিস্থিতিতে শত্রুপক্ষকে বিভ্রান্ত করার এক সুপরিকল্পিত ডিজিটাল কৌশল বা ‘ডিকয়’ সক্ষমতার পরীক্ষা।
রয়টার্সের অনুসন্ধানে চীনের এ নতুন ও জটিল ‘গ্রে-জোন’ বা ছায়াযুদ্ধের তথ্য উঠে এসেছে।
ফ্লাইটট্র্যাকিং ওয়েবসাইট ‘ফ্লাইটরেডার২৪’-এর তথ্য বিশ্লেষণ করে রয়টার্স লিখেছে, গেল বছরের অগাস্ট থেকে এ পর্যন্ত ‘ওয়াইআইএলও৪২০০’ কল সাইন ব্যবহার করে অন্তত ২৩টি ফ্লাইট চালানো হয়েছে, যা চীনের পরিচিত এক দীর্ঘসময় উড়তে পারা সামরিক ড্রোনের কল সাইন। তবে ড্রোনটি ওড়ার সময় অন্য প্লেনের রেজিস্ট্রেশন নম্বর ব্যবহার করে তথ্য পাঠাচ্ছিল।
ফ্লাইট বিশ্লেষণ অনুসারে, ড্রোনের এসব যাত্রাপথ চীনের হাইনান প্রদেশ থেকে পূর্ব দিকে ফিলিপিন্সের দিকে যায়, যা বিতর্কিত প্যারাসেল দ্বীপপুঞ্জের কাছাকাছি। এরপর তা ভিয়েতনামের উপকূল ঘেঁষে নিচের দিকে অগ্রসর হয়।
প্রথমবারের মতো এ অভিযানের ব্যাপকতা ও জটিলতার বিষয়টি সামনে এনেছে রয়টার্স।
আঞ্চলিক তিনজন কূটনীতিক, চারজন গোয়েন্দা বিশ্লেষক ও তিনজন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞের মতে, এ তৎপরতা দক্ষিণ চীন সাগর ও তাইওয়ানের আশপাশে চীনের ক্রমাগত উপস্থিতির নতুন ও সুপরিকল্পিত এক কৌশল। চীনা কমিউনিস্ট পার্টি তাদের সামরিক বাহিনীকে যুদ্ধের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত রাখার যে নির্দেশ দিয়েছে, তারই অংশ এ অভিযান। যার মাধ্যমে তারা সরাসরি ইলেকট্রনিক যুদ্ধ ও প্রতারণার বিভিন্ন কৌশল ঝালিয়ে নিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের ছদ্মবেশ বা পরিচয় গোপন করার কৌশলটি সামরিক রেডারকে পুরোপুরি ফাঁকি দিতে না পারলেও যুদ্ধের সময় চরম বিভ্রান্তি তৈরি করবে, যা গুরুত্বপূর্ণ নজরদারি কার্যক্রম লুকিয়ে রাখতে বা ভুল তথ্য ছড়াতেও ব্যবহৃত হতে পারে।
ডেটা প্ল্যাটফর্ম ‘পিএলএট্র্যাকার’-এর প্রতিষ্ঠাতা বেন লুইস বলেছেন, “এর আগে আমরা এমন কিছু দেখিনি। বিষয়টি কোনো দুর্ঘটনা নয়, বরং সরাসরি আকাশপথে চালানো সুপরিকল্পিত এক প্রতারণার ছক।”
তবে এসব ফ্লাইটের উদ্দেশ্য নিয়ে রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়।
বেলারুশীয় মালবাহী প্লেন
‘ফ্লাইটরেডার২৪’-এর তথ্যে এসব ফ্লাইটকে বেশিরভাগ সময় বেলারুশের ‘রাডা এয়ারলাইন্স’-এর ‘ইল্যুশিন-৬২’ কার্গো প্লেন হিসেবে দেখা গেছে। পাশাপাশি এগুলো ব্রিটিশ রয়াল এয়ার ফোর্সের ‘টাইফুন’, উত্তর কোরিয়ার যাত্রীবাহী প্লেন এবং বেনামী এক ‘গালফস্ট্রিম’ বিজনেস জেট হিসেবেও শনাক্ত হয়েছে।
ডিসেম্বরের মাঝামাঝি থেকে এই ‘ওয়াইআইএলও৪২০০’ কল সাইনের ড্রোনটি উত্তর-পশ্চিম চীনেও বেশ কয়েকবার উড়েছে। সবশেষ ১৫ ফেব্রুয়ারি ড্রোনটিকে ছোট এক যাত্রীবাহী প্লেন ‘পিলাটাস পিসি-১২’ নামে দেখা গেছে।
সাধারণত আন্তর্জাতিক বেসামরিক প্লেন চলাচল কর্তৃপক্ষ বা আইসিএও নিয়ম অনুসারে, প্রতিটি প্লেনের নির্দিষ্ট ২৪-বিটের কোড বা ঠিকানা থাকে। ট্রান্সপন্ডারের মাধ্যমে পাঠানো এ কোডটি প্লেনের অবস্থান, দিক ও গতি বুঝতে সাহায্য করে।
প্রতিটি প্লেনের জন্য এ কোডটি আলাদা হলেও বিশেষজ্ঞ ও পাইলটরা বলছেন, ট্রান্সপন্ডার রিকোড করে অন্য প্লেনের নিবন্ধন নম্বর চুরি করা সম্ভব।
২০২৪ সালের অগাস্টে রাডা এয়ারলাইন্সের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় মার্কিন প্রশাসন। তাদের বিরুদ্ধে রাশিয়ান সামরিক বাহিনীর সঙ্গে যোগ হয়ে ‘ওয়াগনার’ দলের সদস্যদের আফ্রিকায় আনা-নেওয়া ও বন্যপ্রাণী পাচারের অভিযোগ ছিল।
‘ফ্লাইটরেডার২৪’-এর তথ্য অনুসারে, আসল বেলারুশীয় প্লেনটি এ পুরো সময় অন্য একটি কল সাইন ব্যবহার করে সচল ছিল। একবার এমনও দেখা গেছে, আসল প্লেনটি যখন আকাশে উড়ছে ঠিক তখনই চীনা ড্রোনটি এর পরিচয় ব্যবহার করে অন্য কোথাও উড়ছে।
এ বিষয়ে রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি রাডা এয়ারলাইন্স ও ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়।
এদিকে, আন্তর্জাতিক বেসামরিক প্লেন চলাচল কর্তৃপক্ষ বা আইসিএও বলেছে, তারা সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সুনির্দিষ্ট কোনো বিষয় বা জল্পনা নিয়ে মন্তব্য করে না।
বিভ্রান্তি ছড়ানোর অভিযান
হাইনান দ্বীপের চিওনঘাই বোয়াও আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ওড়া ড্রোনটিকে প্রায়ই ঘণ্টার পর ঘণ্টা আকাশে উড়তে দেখা যায় এবং নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় তারার মতো বা বালিঘড়ির মতো নকশা তৈরি করে উড়েছে।
গোয়েন্দা বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের উড়ান পদ্ধতি সাধারণত নজরদারিতে থাকা বড় সামরিক ড্রোনের ক্ষেত্রে দেখা যায়। ড্রোনটি দক্ষিণ চীন সাগরের এমন কিছু স্পর্শকাতর এলাকায় চলাচল করেছে, যেখানে সাবমেরিন বা ডুবোজাহাজের আনাগোনা বেশি থাকে।
চীনা সামরিক ড্রোনগুলো কোনো কল সাইন বা রেজিস্ট্রেশন নম্বর ছাড়াই বা সম্পূর্ণ পরিচয় গোপন রেখে চলাচল করে। তবে রয়টার্স যে ২৩টি ফ্লাইটের তথ্য পর্যালোচনা করেছে তার মধ্যে দুটি ছিল খুব অস্বাভাবিক।
৫ ও ৬ অগাস্টের ফ্লাইটে ড্রোনটি প্রথমে ব্রিটিশ ‘টাইফুন’ প্লেনের কোড ব্যবহার করেছে, এরপর কেবল ২০ মিনিটের মধ্যে আরও তিনটি প্লেনের সংকেত পরিবর্তন করে শেষ পর্যন্ত বেলারুশীয় প্লেনের পরিচয় দিয়ে অবতরণ করেছে।
অন্য আরেক ঘটনায় দেখা গেছে, ১৮ নভেম্বর ড্রোনটি যখন বেলারুশীয় প্লেনের পরিচয় দিয়ে আকাশে উড়ছিল, ঠিক সেই সময়ই মূল বেলারুশীয় প্লেনটি তেহরানের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে।
সিঙ্গাপুরভিত্তিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক আলেকজান্ডার নিল বলেছেন, উত্তেজনা বাড়লে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার জন্য এমন বিষয় চীনের নতুন ডিজিটাল কৌশল হতে পারে। ফলে এগুলো কেবল মহড়া নয়, বরং সরাসরি সংঘাতের প্রস্তুতি।
তিনি আরও বলেছেন, প্রতিদ্বন্দ্বীদের মনে বিভ্রান্তি ছড়াতে পারে এমন যে কোনো কিছুই চীনের জন্য সুবিধাজনক। কারণ আধুনিক যুদ্ধে কয়েক মিলিসেকেন্ডের বিভ্রান্তিও অনেক বড় পার্থক্য গড়ে দিতে পারে।
এ বিষয়ে রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন।
বিশ্লেষকদের মতে, ‘ওয়াইআইএলও৩২০০’ কল সাইনটি ‘উইং লুং ২’ নামের শক্তিশালী এক ড্রোনকে নির্দেশ করে, যা আমেরিকার ‘রিপার’ ড্রোনের সমপর্যায়ের এবং এর ডানার বিস্তার প্রায় ২০.৫ মিটার।
ড্রোনটি প্রধানত নজরদারির জন্য তৈরি হলেও এ দিয়ে নিখুঁত ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বা সাবমেরিন বিধ্বংসী অভিযান চালানো সম্ভব। এ ধরনের ড্রোন চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত ‘চেংদু এয়ারক্রাফট কর্পোরেশন’ তৈরি করে।
তবে এ বিষয়ে রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি সংস্থাটি।
অনলাইন ফ্লাইট ট্র্যাকার অ্যামেলিয়া স্মিথ প্রথম এ ‘উইং লুং ২’ ড্রোনের গতিবিধি শনাক্ত করেন। তিনি বিভিন্ন ফ্লাইটের তথ্য, সরকারি ঘোষণা ও সংবাদপত্রের খবর বিশ্লেষণ করে চীনা সামরিক ড্রোনের ‘কল সাইন’ ব্যবহারের বিষয়টি নিশ্চিত হন।
লুইস, স্মিথ ও আরও দুইজন গোয়েন্দা বিশ্লেষক বলেছেন, ‘বোয়া’ বিমানবন্দর থেকে পরিচালিত এ ড্রোনটি আসলে চীনের কোন সংস্থা নিয়ন্ত্রণ করছে তা এখনও স্পষ্ট নয়। এ বিমানবন্দরটি সামরিক ও বাণিজ্যিক উভয় কাজেই ব্যবহৃত হয়।
রয়টার্সের হাতে আসা জুলাই, সেপ্টেম্বর ও জানুয়ারির স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা গেছে, বিমানবন্দরের বাড়তি এক অংশের টারম্যাকে একাধিক বড় ড্রোন ও সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ভবন দাঁড়িয়ে রয়েছে।
‘ফ্লাইটরেডার২৪’-এর জনসংযোগ পরিচালক ইয়ান পেচেনিক বলেছেন, ট্র্যাকারটি হাইনানের ফ্লাইটগুলো টার্গেট করেছে। এর আগে কেবল দুর্ঘটনাবশত ভুল কোডিং বা ত্রুটিপূর্ণ ডেটা দেখলেও তারা এমন পরিকল্পিত কার্যক্রম আগে কখনও দেখেননি।
“এ ড্রোনের উড়ান পদ্ধতি ও যেভাবে ২৪-বিটের ঠিকানাগুলো ব্যবহৃত হয়েছে তাতে মনে হয় না যে এমনটি ট্রান্সপন্ডার প্রোগ্রামিংয়ের কোনো ভুল।”
এসব ফ্লাইট কি আগে থেকে সেট করা পথে চলছে নাকি ভূমি থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে তা নিশ্চিত করেত পারেনি রয়টার্স।
তবে এসব পথ এমন সব এলাকার ওপর দিয়ে গিয়েছে, যেখানে নৌবাহিনীর ব্যাপক তৎপরতা রয়েছে, যেমন হাইনানের দক্ষিণে চীনা সাবমেরিন ঘাঁটির কাছের জলসীমা এবং পূর্ব দিকে তাইওয়ান ও ফিলিপাইনের মধ্যবর্তী বাশি চ্যানেল আছে।
এ চ্যানেলটি প্রশান্ত মহাসাগরে প্রবেশের জন্য চীনা নৌবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ পথ।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক আলেকজান্ডার নিল বলেছেন, “এসব ড্রোনের ওড়ার ধরন দেখে মনে হচ্ছে তা তাইওয়ানে কোনো সামরিক অভিযানের মহড়া। তাইওয়ানের মানচিত্রের ওপর এ ২৩টি ফ্লাইটের পথ বসিয়ে দেখা গেছে, ড্রোনটি দেশটির গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন সামরিক এলাকার ওপর দিয়ে গেছে।
“এসব পথ তাইওয়ানের রাজধানী তাইপেইকেন্দ্রিক হলেও দ্বীপটির দক্ষিণ উপকূল পর্যন্ত বিস্তৃত। এ ছাড়া ড্রোনের পূর্বদিকের পথগুলো ওকিনাওয়া ও রিউকিউ দ্বীপপুঞ্জে অবস্থিত জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটির খুব কাছ দিয়ে গেছে।
“বিষয়টি বেশ উদ্বেগজনক, দক্ষিণ চীন সাগর জুড়ে বড় ধরনের এসব মহড়া আসলে তাইওয়ানের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে আঘাত হানার প্রস্তুতিরই অংশ।”




















