ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় এখন পর্যন্ত ছয় মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্র নিশ্চিত করেছে। পেন্টাগন ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর দেয়া তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ইরান অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে মার্কিন সামরিক সক্ষমতার মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত রাডার সিস্টেম, বিমানঘাঁটি এবং রসদ সরবরাহ কেন্দ্রগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। বিশেষ করে বাহরাইন, কুয়েত, কাতার ও জর্ডানের মতো দেশগুলোতে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলো ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং শাহেদ কামিকাজে ড্রোনের হামলার মুখে পড়েছে। যদিও পূর্ণাঙ্গ ও স্বাধীনভাবে যাচাই করা ক্ষয়ক্ষতির চিত্র এখনো স্পষ্ট নয়।
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী ও অস্থায়ী মিলিয়ে প্রায় ১৯টি সামরিক স্থাপনা রয়েছে। বাহরাইন, মিসর, ইরাক, জর্ডান, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে অবস্থিত আটটি স্থায়ী ঘাঁটিতে ২০২৫ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত ৪০-৫০ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন ছিল। কাতারের আল উদেইদ বিমানঘাঁটি মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের অগ্রবর্তী সদর দপ্তর হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সেখানে প্রায় ১০ হাজার সেনা অবস্থান করেন। পারস্য উপসাগরে অবস্থান করছে পারমাণবিক শক্তিচালিত বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন ও ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড, যেগুলোতে মিলিয়ে ১০ হাজারের বেশি নৌসদস্য ও ১৩০টির বেশি যুদ্ধবিমান রয়েছে। ইরানি সামরিক কর্তৃপক্ষ এ অঞ্চলের সব মার্কিন ঘাঁটিকে ‘বৈধ লক্ষ্যবস্তু’ বলে ঘোষণা করেছে।
বাহরাইনে অবস্থিত ইউএস নেভাল সাপোর্ট অ্যাক্টিভিটি মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তর। সেখানে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও শাহেদ ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। স্যাটেলাইট ছবিতে সংরক্ষণাগার ও রাডার স্থাপনায় ক্ষতির চিহ্ন দেখা গেছে বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়েছে। একটি ভিডিওতে একটি ড্রোনকে রাডার গম্বুজে আঘাত করতে দেখা যায়। যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ বিবরণ প্রকাশ না করলেও দুই মার্কিন সেনা আহত হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছে।
ইরাকের এরবিল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি টানা দুইদিন হামলার মুখে পড়ে। ড্রোন আঘাত হানে মার্কিন কনস্যুলেটের আশপাশেও। ইরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম কনস্যুলেট ধ্বংসের দাবি করলেও যুক্তরাষ্ট্র তা নিশ্চিত করেনি। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর নাগরিকদের ওই এলাকা এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে। অতীতেও ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়ারা ইরাকে মার্কিন স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে; বর্তমান সংঘাতে সে ঝুঁকি আরো বেড়েছে বলে পর্যবেক্ষকদের মত।
জর্ডানের মুয়াফফাক সালতি বিমানঘাঁটির আকাশে দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করা হয়েছে বলে জর্ডান সরকার জানিয়েছে। তাদের দাবি, প্রাণহানি হয়নি। তবে অনিশ্চিত ভিডিও ফুটেজে একটি ক্ষেপণাস্ত্র লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করেছে—এমন ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। এ ঘাঁটিতে সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন এফ-৩৫সহ বহু যুদ্ধবিমান মোতায়েন করা হয়েছিল।
কুয়েতে আলি আল-সালেম বিমানঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার খবর পাওয়া গেছে। কুয়েতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলেছে, অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে, তবে স্যাটেলাইট ছবিতে কয়েকটি ভবনে ক্ষতির চিহ্ন দেখা গেছে। দক্ষিণ কুয়েতের ক্যাম্প আরিফজানে হামলায় ছয় মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন বলে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর নিশ্চিত করেছে। আরো অন্তত চারজন আহত হয়েছেন। মার্কিন কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি ক্ষেপণাস্ত্র সুরক্ষিত ট্যাকটিক্যাল অপারেশন সেন্টারে আঘাত হানে। একই দিনে কুয়েতের আকাশে তিনটি মার্কিন এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়, যা পেন্টাগন ‘ফ্রেন্ডলি ফায়ার’ বলে উল্লেখ করেছে।
কাতারের আল উদেইদ বিমানঘাঁটিতেও ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে বলেও জানা গেছে। কাতারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় একটি প্রাথমিক সতর্কতা রাডার স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। এ রাডার ব্যবস্থার মূল্য প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আল উদেইদ মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বিমান অভিযানের প্রধান কেন্দ্রগুলোর একটি হওয়ায় এ হামলা কৌশলগত গুরুত্ব বহন করে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতে আল-ধাফরা বিমানঘাঁটির আশপাশে ধোঁয়া দেখা গেছে এবং দুবাইয়ের জেবেল আলি বন্দরে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। আল-ধাফরায় মার্কিন রিফুয়েলিং ট্যাংকার ও নজরদারি ড্রোন মোতায়েন থাকে। ইরান শতাধিক ড্রোন ও একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের দাবি করলেও যুক্তরাষ্ট্র ও আমিরাতের পক্ষ থেকে পূর্ণাঙ্গ ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ প্রকাশ করা হয়নি।
সৌদি আরবে প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটির ওপর নিক্ষিপ্ত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার দাবি করেছে রিয়াদ। কোনো স্থাপনা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কিনা, তা স্পষ্ট নয়। তবে ড্রোন হামলার পর রাস তানুরা তেল শোধনাগারে সাময়িকভাবে উৎপাদন বন্ধ রাখা হয়েছে। এ স্থাপনা সৌদি আরবের বৃহত্তম পরিশোধনাগারগুলোর একটি।
হতাহতের সংখ্যা নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্যে বড় ফারাক রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ছয় সেনা নিহত ও কয়েকজন আহত হওয়ার কথা স্বীকার করেছে। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর দাবি করেছে, তাদের হামলায় অন্তত ২০০ মার্কিন সেনা হতাহত হয়েছে। এ দাবির পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো তথ্য এখনো প্রকাশ পায়নি।
ইরানি কিছু গণমাধ্যম দাবি করেছে, বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনে চারটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড এ দাবি অস্বীকার করে জানিয়েছে, রণতরীটিতে কোনো ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত করেনি।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, হামলা ও পাল্টা হামলার এ ধারা দীর্ঘস্থায়ী হলে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা আরো ভঙ্গুর হয়ে পড়তে পারে। এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ইরানের হামলায় মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে প্রাণহানি ও অবকাঠামোগত ক্ষতি ঘটেছে, তবে সামগ্রিক কৌশলগত সক্ষমতা কতটা ব্যাহত হয়েছে, তা নির্ধারণে আরো সময় ও স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন।




















