গত এক সপ্তাহে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সংঘাত মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলেছে। নিচে গত ৭ দিনের (প্রায় ১৪ জুন থেকে ২১ জুন, ২০২৫) প্রধান ঘটনাগুলো তুলে ধরা হলো:
১. ইসরায়েলের বিমান হামলা ও ইরানের পাল্টা হামলা:
- ইসরায়েলের ব্যাপক হামলা: ১৪ জুন থেকে ইসরায়েল ইরানের সামরিক অবকাঠামো এবং পারমাণবিক লক্ষ্যবস্তুতে ধারাবাহিক বিমান হামলা শুরু করে। বিশেষ করে, ইসরায়েল ইরানের ইস্পাহান এবং শিরাজ প্রদেশের সামরিক স্থাপনা, এমনকি ইস্পাহানের একটি পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্র এবং একটি সেন্ট্রিফিউজ উৎপাদন কর্মশালায় হামলা চালায়।
- ইরানের ব্যাপক হতাহত: ইসরায়েলি হামলায় ইরানে ৪০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত এবং ৩,০০০ জনেরও বেশি আহত হয়েছে বলে ইরান নিশ্চিত করেছে।
- গুরুত্বপূর্ণ সামরিক কর্মকর্তাদের নিহত: ইসরায়েলি হামলায় ইরানের কুদস ফোর্সের ফিলিস্তিনি কোরের সিনিয়র কমান্ডার সাঈদ ইজাদি কিউওম শহরে নিহত হয়েছেন। এছাড়াও, ইসরায়েল দাবি করেছে যে তারা রেভল্যুশনারি গার্ডের (IRGC) আরও দুই সিনিয়র কমান্ডারকে লক্ষ্যবস্তু করে হত্যা করেছে, যাদের মধ্যে একজন হামাসের জন্য অর্থায়ন ও অস্ত্র সরবরাহের সাথে জড়িত ছিলেন।
- ইরানের পাল্টা হামলা: ইসরায়েলি হামলার জবাবে ইরান ইসরায়েলের দিকে কয়েক ডজন ক্ষেপণাস্ত্র এবং শত শত ড্রোন নিক্ষেপ করে। তবে ইসরায়েলের অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বেশিরভাগ হামলা প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছে বলে জানা গেছে। ইসরায়েলের উপকূলীয় শহর নেতানিয়ার আকাশে রকেটের আলামত দেখা গেছে এবং তেল আবিবের ভবনগুলোতে আগুন লাগার খবরও এসেছে। ইরানি হামলায় ইসরায়েলে কমপক্ষে ২৪ জন নিহত হয়েছেন।
২. পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে উত্তেজনা:
- আইএইএ’র উদ্বেগ: আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার (IAEA) মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রসি মন্তব্য করেছেন যে ইরান মাত্র ১৫ দিনের মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্র বানানোর সক্ষমতা অর্জন করতে পারে। তিনি আরও নিশ্চিত করেছেন যে ইস্পাহানের একটি পারমাণবিক সুবিধা, যেখানে সেন্ট্রিফিউজ তৈরি হয়, ইসরায়েলি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
- ইরানের অনমনীয় মনোভাব: ইরান জানিয়েছে যে ইসরায়েলি আগ্রাসন বন্ধ না হলে তারা তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কোনো আলোচনা করবে না।
৩. আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টা:
- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরায়েল-ইরান সংঘাত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং জানিয়েছেন যে ইসরায়েলের পক্ষ হয়ে যুদ্ধে জড়িত হবেন কিনা সে বিষয়ে তিনি আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেবেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে রক্ষা করতে এবং ইরানের হুমকি মোকাবেলায় মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক বিমান ও যুদ্ধজাহাজ সরিয়ে নিচ্ছে।
- তুরস্কের মধ্যস্থতার প্রস্তাব: তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোগান ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা কমাতে আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছেন এবং তুরস্ককে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালনের জন্য প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন।
- ইউরোপীয় ইউনিয়নের তৎপরতা: ব্রিটেন, ফ্রান্স এবং জার্মানির শীর্ষ কূটনীতিকরা জেনেভায় ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির সাথে বৈঠক করেছেন। তারা পারমাণবিক আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার আশা প্রকাশ করেছেন। ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং কূটনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন।
- জাতিসংঘে উত্তেজনা: জাতিসংঘে ইসরায়েলি ও ইরানি কূটনীতিকদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ দেখা গেছে।
৪. অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি ও অন্যান্য ঘটনা:
- ইরানের ইন্টারনেট শাটডাউন: ইসরায়েলি বিমান হামলার পর ইরান দেশের ইন্টারনেট সংযোগ সীমিত করে দিয়েছে, যার ফলে দেশের ভেতরের খবর বাইরে আসা কঠিন হয়ে পড়েছে।
- গ্রেফতার: ইরানের কওম প্রদেশে পুলিশ ইসরায়েলি গুপ্তচর সংস্থার সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে ২২ জনকে গ্রেফতারের কথা জানিয়েছে। এছাড়া, গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে একজন জার্মান সাইকেল আরোহীকে আটকের কথাও ইরান স্বীকার করেছে।
- লেবাননে হামলা: ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে হিজবুল্লাহর একটি অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে, যা এই সংঘাতের আঞ্চলিক বিস্তারের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
- গাজায় যুদ্ধ: ইসরায়েল-ইরান সংঘাত বৃদ্ধির মধ্যেও গাজায় হামাসের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের যুদ্ধ তীব্র গতিতে চলছে। গত ৪৮ ঘণ্টায় গাজায় কমপক্ষে ২০০ জনের বেশি মানুষের লাশ হাসপাতালে আনা হয়েছে এবং ১,০০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন।



















