খোদ রাজধানীতেই রয়েছে টিকা’র পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বিষয়ক উদ্বেগ। এছাড়াও ঢাকার অধিকাংশ কওমি মাদ্রাসাতেই নেই ‘ফার্স্ট এইড কিট’। ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলোতে কিটবক্স থাকলেও নিকটসস্থ হাসপাতালের সঙ্গে অনেত স্কুলেরই নেই কোনো অংশীদারিত্বের সহযোগিতা চুক্তি।
ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল ও কওমি মাদ্রাসা নির্বিশেষে শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে ভ্যাকসিন গ্রহনের ক্ষেত্রে এমন ব্যত্যয় ও সংশয় খুঁজে পেয়েছেন গবেষকরা। ঢাকা সিটি কর্পোরেশনে স্বাস্থ্য সুরক্ষা ফাউন্ডেশনের আয়োজনে এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা ফাউন্ডেশনের কৌশলগত অংশীদারিত্বে পরিচালিত জরিপ থেকে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। বাংলাদেশ সরকারের ইপিইআই কর্মসূচির আওতায় আগামী ১২ অক্টোবর থেকে শুরু হতে যাওয়া টাইফয়েড কনজুগেট ভ্যাকসিন (টিসিভি) কার্যক্রমকে আরো জোরদার করার লক্ষ্যে প্রথম বারের মতো এই গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।
এ নিয়ে আয়োজিত সভায় সরকারের টিভিসি কার্যক্রম সফল করতে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল ও কওমি মাদ্রাসার বাবস্থাপনা কমিটি ও অভিভাবকদের অনুমোদনের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। গবেষণার পর্যালোচনা শেষে একইসঙ্গে টিকাদানের ক্ষেত্রে অভিভাবক, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের উদ্বেগ চিহ্নিত করে সে অনুযায়ী বাবস্থা গ্রহণ করা এবং যদি কোন গুজব দেখা দেয় সে ক্ষেত্রে তা দূরীকরণে বাবস্থা নেয়ার পাশাপাশি টিকাদান কার্যক্রমের রেকর্ড ও কভারেজ ডিজিটালি সংরক্ষণ এবং যাদের জন্ম নিবন্ধন নেই তাদের ক্ষেত্রে কাগজে সংরক্ষণ করতে পরামর্শ দেয়া হয়েছে।
রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ৮ অক্টোবর, বুধবার স্বাস্থ্য সুরক্ষা ফাউন্ডেশনের আয়োজনে এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা ফাউন্ডেশনের কৌশলগত অংশীদারিত্বে পরিচালিত গবেষণাটি প্রকাশ করা হয়। অনুষ্ঠানে গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করেন গ্যাভী সিএসও’র চেয়ার এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষা ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক ডাঃ নিজাম উদ্দীন আহম্মেদ। এছাড়াও টাইফয়েড টিকাদান ক্যাম্পেইন ২০২৫ সম্পর্কে উপস্থাপন করেন ইপিআই অ্যান্ড সারভিলেন্স মেডিকেল অফিসার ডাঃ রাজিব সরকার। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (জনস্বাস্থ্য অনুবিভাগ) এ. টি. এম. সাইফুল ইসলাম।
উক্ত অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য সেবা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক ( পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডাঃ শেখ ছাইদুল হক, পরিচালক (এমআইএস) ডাঃ আবু আহম্মদ আল মামুন, প্রাক্তন লাইন ডিরেক্টর, ইপিআই ডাঃ এস এম আবদুল্লাহ আল মুরাদ, প্রাক্তন প্রোগ্রাম ম্যানেজার (ইপিআই) ডাঃ আবুল ফজল মোঃ সাহাবুদ্দিন খান, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এনপিও ডাঃ চিরঞ্জিত দাস, বাংলাদেশ সিএসও কোয়ালিসন ফর হেল্থ অ্যান্ড ইমুনাইজেশনের ভাইস চেয়ার ও অপরাজেয় বাংলা’র নির্বাহী পরিচালক ওয়াহিদা বানু এবং ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল, কওমি মাদ্রাসা এবং বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
স্বাস্থ্য সুরক্ষা ফাউন্ডেশন পরিচালিত গবেষণা প্রকল্পের পলিসি অ্যাডভাইজার অধ্যাপক ড. মোঃ রফিকুল ইসলামের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে উপস্থাপিত গবেষণা প্রতিবেদনে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলোর স্বাস্থ্য ও টিকাদান পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অধিকাংশ স্কুলে ফার্স্ট এইড বক্স আছে এবং কিছু স্কুল নিকটস্থ হাসপাতালের সঙ্গে MOU রয়েছে। কিছু স্কুলে পূর্ণকালীন ডাক্তার ও শিশু মনোবিজ্ঞানী আছে এবং ডেন্টাল ও চোখের পরীক্ষা ক্যাম্পও আয়োজন করা হয়। অধিকাংশ ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে ভ্যাকসিন গ্রহনের ক্ষেত্রে এক ধরণের হেজিটেনসি পরিলক্ষিত হয়। বিশেষ করে ভ্যাকসিনের নিরাপত্তা, মান ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে তারা উদ্বেগ প্রকাশ করে এবং অনেকেই প্রাইভেট হাসপাতালে ভ্যাকসিন নিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। তাছাড়া কোন কোন স্কুলে স্থান সংকুলান, অনুমোদনের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক জটিলতা, সচেতনতার অভাব এবং সীমিত প্রচারণার কারণে টিসিভি ক্যাম্পেইনের দৃশ্যমানতা গবেষণার সময়ে কম পরিলক্ষিত হয়েছে। শিক্ষক ও স্কুল বাবস্থাপনা কমিটি টিসিভি সম্পর্কিত প্রশিক্ষণ পাননি। অনুরূপ সরকারি বা NGO ভ্যাকসিনেটররা অনুমোদন ছাড়া স্কুলে প্রবেশ করতে পারে না যা টিকা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ। স্কুল বাবস্থাপনা কমিটি শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং শিক্ষার্থীর কল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন তবে অভিভাবকদের অনমোদন ছাড়া টিকা গ্রহনের মত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে পারে না।
অধিকাংশ কওমি মাদ্রাসাগুলোতে স্বাস্থ্য ও টিকাদান কার্যক্রম খুবই সীমিত। শিক্ষার্থীদের শারিয়াহ অনুযায়ী শারীরিক পরিচ্ছন্নতা শিখানো হয়, কিন্তু ভ্যাকসিন সচেতনতা তুলনামুলকভাবে কম। ফার্স্ট এইড কিট অধিকাংশ মাদ্রাসায় নেই, এবং অসুস্থ হলে জরুরী প্রয়োজনে শিক্ষার্থীদের নিকটস্থ ফার্মেসি, ক্লিনিক বা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। কিছু মাদ্রাসায় সাধারণ স্বাস্থ্যসেবা বিষয়ে কখনও কখনও ক্যাম্প পরিচালিত হয়, তবে টিকাদান ক্যাম্পেইনে (Covid-19, HPV ছাড়া) অভিজ্ঞতা খুবই কম। টিসিভি (টাইফয়েড কনজুগেট ভ্যাকসিন) কার্যক্রম চালাতে কওমি মাদ্রাসা বাবস্থাপনা কমিটি ও শিক্ষকের অনুমোদন প্রয়োজন, তবে মাদ্রাসাগুলোতে টিকা বিষয়ে তথ্য ও প্রচারণার দৃশ্যমানতা খুবই কম। শিক্ষক ও বাবস্থাপনা কমিটি ভ্যাকসিনের মান, নিরাপত্তা ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে উদ্বিগ্ন। কখনও কখনও টিকা সম্পর্কে ষড়যন্ত্র তত্ত্বের উপস্থিতিও লক্ষ্য করা যায়। এছাড়া মাদ্রাসায় টিকাদানে অনলাইনে নিবন্ধনের সুযোগ খুবই সীমিত। ছেলে মাদ্রাসায় নারী ভ্যাকসিনেটর এবং মেয়ে মাদ্রাসায় পুরুষ ভ্যাকসিনেটর কাজ করার অনুমোদন নেই। ছোট মাদ্রাসায় টিকাদান কার্যক্রমের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা ও সুবিধা কম, অনুমোদন নেওয়া দীর্ঘ প্রক্রিয়া, এবং সরকারের যথাযত কতৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ কম থাকায় টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনার অন্যতম চ্যালেঞ্জ। এছাড়া মাদ্রাসা নিজস্ব বাবস্থাপনায় পরিচালিত হয় এবং অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ তুলনামুলকভাবে সীমিত এবং নিয়মিত অভিভাবক সভা হয় না সেটিও টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনার থেকে একটি ইউনিক সিচুয়েশন।
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, গবেষণাটিতে মিক্সড মেথড ব্যবহার করে তথ্য সংগ্রহ এবং প্রক্রিয়াজাত করা হয়েছে। এই সমীক্ষায় ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল এবং কওমি মাদ্রাসা উভয় প্রতিষ্ঠানের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। স্কুল ও মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং পরিচালনা কমিটির সাথে সম্মুখ সাক্ষাৎকার এবং Key Informant Interview (KII) তথ্য নেওয়া হয়েছে। এছাড়া শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক এবং পরিচালনা কমিটির সঙ্গে Focus Group Discussion (FGD) এবং অংশগ্রহণমূলক পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি ব্যবহার করে তথ্য সংগ্রহ এবং যাচাই বাছাই করা হয়েছে।
গবেষণায় সেকেন্ডারি উৎস হিসেবে স্কুল ও মাদ্রাসার নথি, জাতীয় EPI নির্দেশিকা, WHO/Gavi (2025) প্রতিবেদন, ব্রিটিশ কাউন্সিল ও কওমি বোর্ডের নথি, DGHS/BBS তথ্য এবং প্রতিষ্ঠানের রেকর্ড পর্যালোচনা করা হয়েছে। এতে প্রতিষ্ঠানগুলোর অবকাঠামো, ভর্তি, সামাজিক প্রতিবন্ধকতা (যেমন টিকা সম্পর্কিত অবস্থান), প্রশাসন, সংযুক্তি, সুবিধা ও যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। তথ্যের যথার্থতা ও নৈতিক মানদণ্ড নিশ্চিত করতে একাধিক উৎস থেকে যাচাই করা হয়েছে, অংশগ্রহণকারীদের সম্মতি নেয়া হয়েছে এবং নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।





















