প্রায় এক দশক আগে লকহিড মার্টিনের সঙ্গে মিলে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা যে বিশেষ সুপারসনিক জেট তৈরির কাজ শুরু করেছিল, তা প্রথমবারের মতো ক্যালিফোর্নিয়ার আকাশে সফলভাবে উড়ান সম্পন্ন করেছে।
‘এক্স-৫৯’ (X-59) নামের এই প্লেনটি ‘কোয়ায়েট সুপারসনিক টেকনোলজি’ (Quiet SuperSonic Technology) বা ‘নীরব সুপারসনিক প্রযুক্তি’-তে চলে। এটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যা সুপারসনিক গতিতে উড়লেও অতীতের প্লেনগুলোর মতো জোরালো ‘সনিক বুম’ বা তীব্র বিস্ফোরণধ্বনি তৈরি করে না।
পরীক্ষামূলক এই উড়ান সফল হওয়ার পর নাসা এবং মার্কিন অ্যারোস্পেস ও প্রতিরক্ষা কোম্পানি লকহিড মার্টিন এখন এই প্লেনটি নিয়ে আরও কিছু পরীক্ষা চালানোর পরিকল্পনা করছে। এসব পরীক্ষায় ‘এক্স-৫৯’ প্লেনের শব্দের ধরন পরিমাপ করা হবে এবং বিভিন্ন এলাকায় সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া যাচাই করা হবে, যাতে ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে কম শব্দে দ্রুতগামী আকাশযাত্রার পথ তৈরি করা যায়।
মঙ্গলবার (২৮ অক্টোবর) যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার পামডেলে অবস্থিত ‘ইউএস এয়ার ফোর্স প্ল্যান্ট ৪২’ থেকে উড়ান শুরু করে প্লেনটি ক্যালিফোর্নিয়ার এডওয়ার্ডসে নাসার ‘আর্মস্ট্রং ফ্লাইট রিসার্চ সেন্টার’-এ নিরাপদে অবতরণ করে।
এই প্রথম উড়ান (মেইডেন ফ্লাইট) নিয়ে লকহিড মার্টিন বলেছে, “এক্স-৫৯ পরিকল্পনা অনুসারে নিখুঁতভাবে কাজ করেছে। উড়ানের সময় আমরা প্লেনের প্রাথমিক উড়ান বৈশিষ্ট্য ও বায়ুর তথ্য যাচাই করেছি এবং নিরাপদে এটিকে তার নতুন ঘাঁটিতে পৌঁছাতে পেরেছি।”
‘এক্স-৫৯’ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো ভবিষ্যতে বাণিজ্যিক সুপারসনিক ফ্লাইট বা অতিদ্রুত যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের পথ তৈরি করা। সুপারসনিক গতি বলতে বোঝায় ম্যাক ১-এর চেয়েও দ্রুত গতিতে, অর্থাৎ ঘণ্টায় প্রায় ৭৬৮ মাইল (প্রায় ১২৩৫ কি.মি.) বেগে চলা। এই গতিতে ভ্রমণ সম্ভব হলে দূরপাল্লার যাত্রা ও মালামাল পরিবহনের সময় নাটকীয়ভাবে কমে যাবে।
নাসা ও লকহিড মার্টিনের তৈরি ‘কোয়েস্ট’ (Quesst) নকশা অনুসারে, ইঞ্জিনটি প্লেনের ওপরের দিকে বসানো হয়েছে এবং এর নাকটি (Nose) অতিমাত্রায় সূচালো। এই বিশেষ নকশার ফলেই প্লেনটি কেবল দ্রুতই নয়, বরং অনেক কম শব্দ করেও চলতে পারে। ২০২৩ সালের এক ব্লগ পোস্টে নাসা জানিয়েছিল, “প্লেনের নিচে থাকা মানুষরা যদি কিছু শুনতে পান, তবে তা জোরালো শব্দ নয়, বরং হালকা মৃদু শব্দ শুনতে পাবেন।”
উল্লেখ্য, ১৯৭৩ সালের ২৭ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রে সুপারসনিক উড়ান নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। এর পেছনে মূল কারণ ছিল এ ধরনের প্লেনের তৈরি তীব্র শব্দদূষণ এবং নাগরিকদের সম্পত্তির ক্ষতির আশঙ্কা। এই নিষেধাজ্ঞা কয়েক দশক ধরে বহাল ছিল। পরে, ২০২৫ সালের জুনে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প এক নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে ‘ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’ (FAA)-কে এই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার বিষয়ে কাজ করার নির্দেশ দেন।
এখন এক্স-৫৯-এর গবেষণা ও পরীক্ষার ফলাফল ভবিষ্যতে এমন একটি মানদণ্ড তৈরিতে সাহায্য করবে, যা ‘স্থলভাগের ওপর দিয়ে বাণিজ্যিক সুপারসনিক প্লেন চালানোর সময় গ্রহণযোগ্য শব্দমাত্রা নির্ধারণে বিজ্ঞানভিত্তিক দিকনির্দেশনা দেবে’।






















