ফেসবুকে আপনার বা আপনার সন্তানের একটি সাধারণ পারিবারিক ছবি কি নিরাপদ? উত্তরটি এখন আতঙ্কজনক। বাংলাদেশে ফেসবুককে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এক ভয়াবহ অনলাইন অপরাধচক্র, যেখানে শিশু ও কিশোরীদের সাধারণ ছবি সংগ্রহ করে সেগুলোকে যৌন নিপীড়নের লক্ষ্যবস্তু বানানো হচ্ছে। বিকৃত মানসিকতার হাজার হাজার সদস্য নিয়ে পরিচালিত এসব গ্রুপে ৯ থেকে ১৪ বছরের শিশুদের ডাকা হচ্ছে ‘কচি’ কোড নামে।
ফেসবুক গ্রুপের আড়ালে যা ঘটছে
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ফেসবুকে ৭৮ হাজার, ৬৯ হাজার এমনকি লক্ষাধিক সদস্যের এমন অসংখ্য গ্রুপ রয়েছে যেখানে প্রতিনিয়ত শিশু ও কিশোরীদের ছবি ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।
এআই ও ডিপফেক: সাধারণ ছবিগুলোকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ব্যবহার করে আপত্তিকর ছবিতে রূপান্তর করা হচ্ছে।
টেলিগ্রাম ও এনক্রিপ্টেড অ্যাপ: ফেসবুক গ্রুপগুলো মূলত একটি ‘ট্রাফিক সোর্স’ হিসেবে কাজ করে। সদস্যদের প্রলুব্ধ করে টেলিগ্রাম বা ‘Zzz’-এর মতো গোপন গ্রুপে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে লাইভ ধর্ষণ সম্প্রচার বা অজ্ঞান করার ওষুধ বিক্রির মতো নৃশংস অপরাধ পরিচালিত হয়।
ভয়াবহ পরিসংখ্যান ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট
২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসেই বাংলাদেশে ১৭৫টি ধর্ষণ এবং ১৪১টি শিশু নির্যাতনের খবর সংবাদমাধ্যমে এসেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লোকলজ্জার ভয়ে প্রকৃত ঘটনার একটি বড় অংশই আড়ালে থেকে যায়।
ইউনসেফের উদ্বেগ: ২০২৫ সালের মার্চে ইউনিসেফ বাংলাদেশে এ ধরনের অপরাধ বৃদ্ধিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে।
রেপ একাডেমি: সিএনএন-এর অনুসন্ধানে উঠে এসেছে বৈশ্বিক এক ‘রেপ একাডেমি’র কথা, যার শিকার হয়েছিল ফ্রান্সের ডমিনিক পেলিকটের স্ত্রী। একই ধরণের বিকৃত ‘সাব-কালচার’ এখন বাংলাদেশেও সক্রিয়।
আইনি সীমাবদ্ধতা ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
আইনজীবী ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরাধীরা প্রকাশ্যে এসব চালিয়ে যাচ্ছে কারণ তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাব।
আইনের ফাঁক: ২০১২ সালের পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনে পোশাক পরিহিত শিশুর ছবি অনেক ক্ষেত্রে অন্তর্ভুক্ত নয়, যা অপরাধীদের সুযোগ দিচ্ছে।
সমন্বয়ের অভাব: সিআইডির মতে, মেটা (ফেসবুক)-এর সাথে বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক সমঝোতা স্মারক না থাকায় তাৎক্ষণিক কন্টেন্ট ডিলিট করা কঠিন হয়ে পড়ে।
ডিবি-র তৎপরতা: মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) জানিয়েছে, তারা ইতিমধ্যে এআই দিয়ে ভুয়া ছবি তৈরির কিছু চক্রকে গ্রেপ্তার করেছে। তবে ফেসবুক মনিটরিং করার সীমাবদ্ধতা এই লড়াইকে কঠিন করে তুলছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. তানিয়া হক এবং সহকারী অধ্যাপক রেজাউল করিম সোহাগের মতে, এটি একটি ‘উৎপাদন, প্রচলন ও ভোগ’-এর স্ব-চালিত চক্র। যারা এসব কন্টেন্ট দেখছে বা রিপোর্ট করছে না, তাদের নীরব সমর্থনই এই চক্রকে শক্তিশালী করছে। যখন সমাজে এ ধরণের অপরাধ ‘স্বাভাবিক’ হিসেবে গেড়ে বসে, তখন তা পরিবর্তন করা কঠিন হয়ে পড়ে।



















