অবৈধ মোবাইল ফোনের দৌরাত্ম্যে প্রতি বছর দুই হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে দেশ। তার চেয়েও ভয়াবহ দিক হলো, এই অনিবন্ধিত, চোরাই ও ক্লোন করা হ্যান্ডসেটই এখন অনলাইন জুয়া, আর্থিক জালিয়াতি (ফ্রড) এবং প্রযুক্তিনির্ভর যাবতীয় অপরাধের প্রধান হাতিয়ার। এই চক্র ভাঙতে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) আবারও ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (NEIR) চালুর হাঁকডাক দিচ্ছে।
এটি তৃতীয় দফা উদ্যোগ। এর আগের প্রতিবারই, যখনই অবৈধ ফোন বন্ধের মূল ফাংশন চালুর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তখনই এক ‘অদৃশ্য কলকাঠি’ নড়ে উঠেছে। কোথায় যেন ফেঁসে গেছে খোদ নিয়ন্ত্রক সংস্থাটিই। প্রশ্ন হলো, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব কি পারবেন সেই অদৃশ্য শক্তির বাধা অতিক্রম করতে? নাকি ২০২৪ সালের মতো এবারও ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের শীর্ষ পর্যায়ের সেই একই সিন্ডিকেটের চাপে এই উদ্যোগ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে?
এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগে বিটিআরসি’র বর্তমান নেতৃত্বের দ্বিধাটি বোঝা জরুরি।
বিটিআরসি’র বর্তমান চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব’) মো. এমদাদ উল বারী সম্প্রতি গণমাধ্যমে যে বক্তব্য দিয়েছেন, তাতেই এই উদ্যোগের জটিলতা স্পষ্ট। তিনি বলেছেন, ‘আগে যেভাবে বলা হচ্ছিল, এনইআইআর কারও প্ররোচনায় পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে দেয়া হয়নি। এই কথাটির সত্যাসত্য নিয়ে আমি প্রশ্ন করবো না… আসলে ভেতরে না গিয়েও এটা বোঝাতে চাইছি যে, এখানে অনেক জটিলতা রয়েছে।’
সেই ‘জটিলতা’ কী? চেয়ারম্যানের ভাষ্যমতে, অবৈধ বা ‘গ্রে’ হ্যান্ডসেট বন্ধ করে দিলে সাধারণ গ্রাহকের লাভ হবে কিনা, বা তাতে হ্যান্ডসেটের দাম কমবে কিনা—সেটিই মূল বিবেচ্য। তিনি বলেন, ‘আমার তো দরকার স্মার্টফোন পেনিট্রেশন বাড়ানো, দরকার সেটটাকে অ্যাফোর্টেবল করা- এটাই প্রায়োরিটি।’
অর্থাৎ, বিটিআরসি’র শীর্ষ নেতৃত্ব নিজেই একটি দ্বিধায় ভুগছে। তারা একদিকে অপরাধ দমনের জন্য এনইআইআর চালু করতে চায়, অন্যদিকে সস্তায় ‘গ্রে’ মার্কেটের ফোন বন্ধ করে দিলে স্মার্টফোনের বাজার সাধারণের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কাও করছে।
চেয়ারম্যানের কথায় এই দ্বন্দ্ব সমাধানের একটি উপায়ও মিলেছে। তিনি জানান, বিটিআরসি’র ইতিহাসে প্রথমবার তারা মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) মোবাইল হ্যান্ডসেটের ওপর ট্যাক্স কমানোর সুপারিশ করেছেন। তার মতে, মোবাইল একটি ‘এনাবলিং’ পণ্য, এটি সাশ্রয়ী না হলে ডিজিটাল সার্ভিস তৈরি হবে না। তিনি বলছেন, তারা এই দুটি কাজ ‘প্যারালালি’ বা সমান্তরালভাবে করছেন—একদিকে ট্যাক্স কমানোর দেনদরবার, অন্যদিকে এনইআইআর চালুর কাজ।
এখানেই লুকিয়ে আছে ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবের আসল চ্যালেঞ্জ।
প্রথমত, তাকে লড়তে হবে সেই ‘অদৃশ্য সিন্ডিকেটের’ বিরুদ্ধে। এই সিন্ডিকেট হলো বছরে দুই হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া চোরাকারবারি, আমদানিকারক এবং সম্ভবত ভেতরের দুর্নীতিবাজদের এক শক্তিশালী চক্র, যারা তিনবার এই উদ্যোগকে ব্যর্থ করে দিয়েছে।
দ্বিতীয়ত, তাকে লড়তে হবে খোদ সরকারি নীতির এই ‘প্যারাডক্স’ বা আপাত-বিরোধী অবস্থার বিরুদ্ধে। সরকার একইসাথে চায়: ১. অপরাধ দমন ও রাজস্ব আদায় (এনইআইআর চালু করে)। ২. স্মার্ট বাংলাদেশ (সস্তায় স্মার্টফোন সহজলভ্য করে)।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, উচ্চ শুল্কের কারণে বৈধ ফোনের দাম বেশি, তাই সস্তা অবৈধ ফোনের বাজার রমরমা। বিটিআরসি চেয়ারম্যানের কথাই স্পষ্ট—ট্যাক্স না কমালে সস্তা ফোনের জোগান বন্ধ করা কঠিন।
ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবের সাফল্য তাই শুধু এনইআইআর সিস্টেমটি প্রযুক্তিগতভাবে চালুর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তার আসল পরীক্ষা হবে, তিনি কি পারবেন সেই ক্ষমতাধর ‘অদৃশ্য সিন্ডিকেট’-কে পরাজিত করতে? তিনি কি পারবেন এনবিআর-কে রাজি করিয়ে বৈধ হ্যান্ডসেটের দাম কমানোর মতো একটি কঠিন নীতিগত সিদ্ধান্ত আদায় করতে, যা বিটিআরসি চেয়ারম্যানের ‘প্রধান প্রায়োরিটি’ পূরণের মাধ্যমে এনইআইআর চালুর পথকে মসৃণ করবে?
প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী হিসেবে তার সেই রাজনৈতিক শক্তি ও সদিচ্ছা আছে কিনা, তার ওপরই নির্ভর করছে এই উদ্যোগের ভাগ্য। আওয়ামী লীগ সরকারের ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার থেকে পলক এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা নাহিদ ইসলামও চালুর চেষ্ট করেন সিন্ডিকেটের চাপে সেই উদ্যোগও ব্যর্থ হয়ে যায় । যদি তিনি ব্যর্থ হন, তবে এটি হবে স্রেফ চতুর্থবারের মতো ‘হাঁকডাক’ দেওয়া, যা প্রমাণ করবে—রাষ্ট্রীয় সংস্কারের চেয়েও শক্তিশালী সেই ‘অদৃশ্য কলকাঠি’।
১. শক্তিশালী ‘অদৃশ্য সিন্ডিকেট’: এটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। যারা বছরে ২,০০০ কোটি টাকার অবৈধ ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে, তারা এই উদ্যোগকে ব্যর্থ করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাবে। তারা আমলাতন্ত্র ও রাজনীতির ভেতরে থাকা তাদের প্রভাব ব্যবহার করে প্রক্রিয়াটিকে আবারও বিলম্বিত বা বানচাল করার চেষ্টা করবে।
২. এনবিআর-এর প্রতিরোধ (স্বার্থের সংঘাত): ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবের মূল লড়াইটি হতে পারে এনবিআর বা অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাথে। মোবাইল হ্যান্ডসেট একটি বড় রাজস্বের উৎস। এনবিআর কিছুতেই এই খাতের শুল্ক কমাতে চাইবে না। ট্যাক্স না কমালে বৈধ ফোনের দাম কমবে না, আর দাম না কমলে এনইআইআর (NEIR) চালু করা প্রায় অসম্ভব। এই আন্তঃমন্ত্রণালয় দ্বন্দ্ব নিরসন করাই হবে তার জন্য কঠিনতম পরীক্ষা।
৩. বিটিআরসি’র নিজস্ব দ্বিধা: বিটিআরসি চেয়ারম্যানের কাছে অবৈধ ফোন বন্ধ করার চেয়েও “স্মার্টফোন পেনিট্রেশন বাড়ানো” এবং “ফোন অ্যাফোর্টেবল করা” বেশি অগ্রাধিকার পাচ্ছে। এই দ্বিধাগ্রস্ত নেতৃত্বকে দিয়ে অপরাধ দমনের মতো কঠোর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
৪. জনরোষের ঝুঁকি: যদি শুল্ক কমানোর মাধ্যমে বৈধ ফোনের দাম কমানো না যায়, তাহলে এনইআইআর চালুর সাথে সাথে সস্তা ‘গ্রে’ মার্কেটের ফোনগুলো বন্ধ হয়ে যাবে। এতে বাজারে ফোনের দাম হঠাৎ বেড়ে গিয়ে একটি জনরোষ তৈরি হতে পারে। এই সিন্ডিকেট সেই জনরোষকে কাজে লাগিয়ে সরকারকে আবারও পিছু হটতে বাধ্য করার চেষ্টা করবে।
কেন এই পদক্ষেপ অপরিহার্য?
১. অপরাধীর পরিচয় শনাক্তকরণ: এই সিস্টেম চালু হলে প্রতিটি সক্রিয় মোবাইল ফোনই কোনো না কোনো এনআইডি’র সাথে সংযুক্ত থাকবে। ফলে, কোনো ফোন থেকে অপরাধ সংঘটিত হলে সেই ফোনের আইএমইআই এবং সংশ্লিষ্ট এনআইডি’র মাধ্যমে অপরাধীকে শনাক্ত করা অনেক সহজ হবে।
২. অনলাইন জুয়া ও আর্থিক প্রতারণা বন্ধ: বর্তমানে অনলাইন জুয়ার সাইটগুলো এবং বিভিন্ন আর্থিক প্রতারক চক্র হাজার হাজার অবৈধ ফোন ও সিম ব্যবহার করে তাদের কার্যক্রম চালাচ্ছে। এনইআইআর চালু হলে এক এনআইডি’র বিপরীতে সীমিত সংখ্যক সিম এবং প্রতিটি সিম নির্দিষ্ট ফোনের সাথে ট্যাগ থাকার কারণে এই অপরাধী চক্রগুলোর কার্যক্রম চালানো রাতারাতি কঠিন হয়ে পড়বে।
৩. চোরাচালান ও রাজস্ব রক্ষা: অবৈধ ফোনের এই বিশাল বাজার শুধু অপরাধীদেরই অভয়ারণ্য নয়, এটি সরকারের রাজস্বেরও একটি বড় রক্তক্ষরণের নাম। কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে প্রতিদিন যে সেটগুলো বাজারে ঢুকছে, তা দেশীয় বৈধ মোবাইল শিল্পকেও ধ্বংস করে দিচ্ছে। এনইআইআর এই চোরাচালানের পথ সরাসরি বন্ধ করে দেবে।
৪. জননিরাপত্তা ও আস্থা: যখন একজন নাগরিক জানবে যে তার কেনা ফোনটি বৈধ এবং তার তথ্য সুরক্ষিত, তখন তা ডিজিটাল লেনদেনের প্রতি আস্থা বাড়াবে। অন্যদিকে, অপরাধীরা যখন বুঝবে যে প্রতিটি ডিভাইসই ট্র্যাক করা সম্ভব, তখন অপরাধ সংঘটনের আগে তারা দুবার ভাববে।
অতএব, কিছু বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জ থাকলেও, দেশের ডিজিটাল নিরাপত্তা, আর্থিক খাতের সুরক্ষা এবং জনশৃঙ্খলা বজায় রাখার স্বার্থে অবৈধ মোবাইল ফোনের এই রমরমা বাজার বন্ধ করার কোনো বিকল্প নেই। ডিসেম্বরের পর থেকে এনইআইআর কার্যকর করার এই সিদ্ধান্তটি শুধু রাজস্ব আদায় নয়, বরং এটি একটি নিরাপদ ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার পথে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপগুলোর একটি হতে চলেছে।
প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী হিসেবে ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবের আসল করণীয় গুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
আসল করণীয় (The Real Tasks)
১. সিন্ডিকেট ভাঙা (রাজনৈতিক পদক্ষেপ): ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবের প্রথম ও প্রধান করণীয় প্রযুক্তিগত নয়, বরং রাজনৈতিক। তাকে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরের ক্ষমতা ব্যবহার করে সেই ‘অদৃশ্য সিন্ডিকেটকে’ চিহ্নিত ও নিষ্ক্রিয় করতে হবে। এই সিন্ডিকেট আমদানিকারক, ব্যবসায়ী এবং সম্ভবত ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ (পিটিডি) বা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত, যারা অতীতে এই উদ্যোগকে ব্যর্থ করেছে।
২. নীতিগত দ্বন্দ্বের নিরসন (ট্যাক্স কমানো): বিটিআরসি’র চেয়ারম্যান নিজেই একটি দ্বন্দ্বের কথা বলেছেন: একদিকে অপরাধ দমন, অন্যদিকে সস্তায় স্মার্টফোন সহজলভ্য করা। ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবের আসল কাজ হলো এই দ্বন্দ্বের অবসান ঘটানো। তিনি যদি এনবিআর-কে দিয়ে বৈধ হ্যান্ডসেটের ওপর উচ্চ শুল্ক না কমাতে পারেন, তাহলে বৈধ ফোনের দাম বেশি থাকবে এবং অবৈধ ফোনের চোরাই বাজার বন্ধ করা অসম্ভব হবে। তাই, এনবিআর-কে ট্যাক্স কমাতে বাধ্য করা—এটাই তার অন্যতম প্রধান করণীয়।
৩. বিটিআরসিকে রাজনৈতিক শক্তি যোগানো: বিটিআরসি’র চেয়ারম্যানের কথায় যে দ্বিধা (“অনেক জটিলতা,” “রাতারাতি করা সম্ভব কিনা”) প্রকাশ পেয়েছে, তা দূর করা ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবের কাজ। তাকে বিটিআরসিকে এই মর্মে রাজনৈতিক “কভার” বা আশ্রয় দিতে হবে যে, সিন্ডিকেটের চাপ উপেক্ষা করে অবৈধ ফোন বন্ধের প্রক্রিয়া শুরু করলে সরকার তাদের পেছনে থাকবে।
৪. জবাবদিহিতা ও সময়সীমা নির্ধারণ: যেহেতু এই উদ্যোগ অতীতে শুধু “হাঁকডাক”-এই সীমাবদ্ধ ছিল, তাই এবার তাকে একটি সুনির্দিষ্ট এবং অপরিবর্তনীয় সময়সীমা (যেমন: ডিসেম্বর বা জানুয়ারি) বেঁধে দিতে হবে এবং এই সময়ের মধ্যে কাজ বাস্তবায়নের জন্য বিটিআরসি’র শীর্ষ নেতৃত্বকে সরাসরি জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।






















