বিশ্বব্যাপী মেমোরি চিপের (র্যাম ও স্টোরেজ) বাজার এখন এক চরম ‘হাইপার-বুল’ বা অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বগতির পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও সার্ভারের জন্য মেমোরি চিপের আকাশচুম্বী চাহিদা সম্প্রতি ২০১৮ সালের ঐতিহাসিক রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে গেছে।
বাজার গবেষণা সংস্থা কাউন্টার পয়েন্ট রিসার্চের প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের চতুর্থ প্রান্তিকে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) মেমোরি চিপের দাম ৪০-৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। এ ঊর্ধ্বগতি এখানেই থামছে না; ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) দাম আরো ৪০-৫০ শতাংশ এবং দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) প্রায় ২০ শতাংশ বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মেমোরি চিপের এ অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির ফলে ল্যাপটপ, স্মার্টফোন ও ডাটা সেন্টার পরিচালন খরচ সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
একই মধ্যে মেমোরি সেমিকন্ডাক্টরের দাম দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় জাপানসহ বিভিন্ন দেশের পিসি নির্মাতারা পণ্যের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। এতে ভোক্তাদের জন্য পিসি কেনা আরো ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছে নিক্কেই এশিয়ার এক প্রতিবেদনে।
জাপানের টোকিওভিত্তিক পিসি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান মাউস কম্পিউটার জানিয়েছে, মেমোরি চিপের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ায় জানুয়ারিতেই পিসির দাম বাড়াতে যাচ্ছে কোম্পানিটি।
এছাড়া সম্প্রতি স্মার্টফোন তৈরির মোট ব্যয়ে মেমোরি চিপের হিস্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২০ সালে আইফোন ১২ প্রো ম্যাক্স তৈরির মোট খরচের মাত্র ৮ শতাংশ ব্যয় হতো মেমোরির পেছনে। তবে ২০২৫ সালে এসে আইফোন ১৭ প্রো ম্যাক্সের ক্ষেত্রে তা ১০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে।
কাউন্টারপয়েন্ট বলছে, বর্তমান বাজারে উচ্চক্ষমতার র্যাম (১৬ জিবি-২৪ জিবি) ও বিশাল স্টোরেজ (৫১২ জিবি-১ টিবি) সমৃদ্ধ ফ্ল্যাগশিপ ফোনগুলোর চাহিদা বাড়ছে। কিন্তু চিপের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে মেমোরি এখন একটি ফোন তৈরির মোট খরচের ২০ শতাংশ বা তারও বেশি অংশ দখল করে নিচ্ছে। এতে স্মার্টফোন নির্মাতারা ফোনের দাম বাড়াতে অথবা একই দামে র্যাম ও স্টোরেজ কমিয়ে দিতে বাধ্য হতে পারে।
সার্ভার ও ডাটা সেন্টারে ব্যবহৃত উচ্চক্ষমতার মেমোরি চিপের দামও বর্তমানে আকাশচুম্বী। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, একটি ৬৪ জিবি আর-ডিআইএমএম মডিউলের দাম ২০২৫ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে ছিল ২৫৫ ডলার, যা গত প্রান্তিকে ৪৫০ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
বাজার বিশ্লেষকদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, এ ঊর্ধ্বগতি অব্যাহত থাকবে এবং আগামী মার্চের মধ্যে দাম ৭০০ ডলারে পৌঁছতে পারে। আর মেমোরি চিপের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির ফলে বড় বড় প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানের ডাটা সেন্টার পরিচালন ব্যয়ও কয়েক গুণ বেড়ে যাবে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ গ্রাহকদের ওপরও পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় মেমোরি চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান স্যামসাং গত সেপ্টেম্বর থেকে প্রতিটি মেমোরি চিপের দাম সর্বোচ্চ ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে ডেস্কটপে ব্যবহৃত ডিআরএম র্যামের দাম ১৭০ শতাংশের বেশি বেড়েছে।
স্যামসাংয়ের শীর্ষ কর্মকর্তা ওনজিন লি বলেন, ‘সেমিকন্ডাক্টর সরবরাহ নিয়ে যে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে যাচ্ছে তা বিশ্বের প্রতিটি মানুষকে প্রভাবিত করবে। তবে আমরা চাই না এ বাড়তি খরচের বোঝা সাধারণ ক্রেতাদের ওপর চাপিয়ে দিতে। কিন্তু পরিস্থিতি এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে পণ্যের দাম বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করতে হচ্ছে।’






















