মোবাইল ফোনের ওপর ভ্যাট ও ট্যাক্স কমানোর নীতিগত সিদ্ধান্তসহ ব্যবসায়ীদের প্রায় সব দাবি মেনে নিয়েছে সরকার। তবে এরপরও স্বাভাবিক হচ্ছে না দেশের বড় মোবাইল মার্কেটগুলোর চিত্র। অভিযোগ উঠেছে, ভ্যাট কমানো স্রেফ অজুহাত; আন্দোলনের নেপথ্যে থাকা মূল লক্ষ্য হলো ‘ন্যাশনাল ইক্যুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার’ (এনইআইআর) বা মোবাইল নিবন্ধন ব্যবস্থা বন্ধ করা। এমনকি দাবি মানার পর অনেক সাধারণ ব্যবসায়ী দোকান খুলতে চাইলেও প্রভাবশালী ‘চোরাই সিন্ডিকেট’-এর হুমকিতে তাঁরা ফিরতে পারছেন না ব্যবসায়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আন্দোলনের শুরু থেকেই সারা দেশের ছোট-বড় মোবাইল মার্কেট থেকে বিপুল পরিমাণ চাঁদা সংগ্রহ করে ব্যবসায়ী সংগঠন এমবিসিবি। আন্দোলনের শুরু থেকেই বলা হয়েছিল, এটি ভ্যাট ও ট্যাক্স কমানোর লড়াই। কিন্তু সরকার ভ্যাট কমানোর পর দেখা যাচ্ছে, আন্দোলনের গতিপথ পাল্টে গেছে। এখন মূল দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে এনইআইআর ব্যবস্থা পুরোপুরি বাতিল করা।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এনইআইআর একটি জননিরাপত্তামূলক প্রকল্প। এটি চালু হলে চোরাই বা অবৈধ পথে আসা ফোন দেশে কোনোভাবেই চলবে না। এই অস্তিত্ব সংকটের মুখে পড়েই বড় আমদানিকারক ও প্রভাবশালী সিন্ডিকেটগুলো এখন দেশজুড়ে বিশৃঙ্খলা তৈরির চেষ্টা করছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংশ্লিষ্ট খাতের এক বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘এনইআইআর নিজে কোনো নজরদারি ব্যবস্থা নয়। এটি কল মনিটর করে না, বার্তা আটকায় না বা ইন্টারনেট কার্যক্রমে আড়ি পাতে না। এসব কাজ আলাদা “ল-ফুল ইন্টারসেপশন” ব্যবস্থার আওতায় পড়ে।’
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) সাবেক সভাপতি ফাহিম মাশরুর বলেন, ‘আমার কাছে এনইআইআরকে নজরদারি ব্যবস্থা মনে হয় না। এটি নির্দিষ্ট কাউকে লক্ষ্য করে তৈরি নয়, বরং একটি সার্বিক ব্যবস্থা। অনলাইন জুয়া ও আর্থিক প্রতারণা মোকাবিলায় এনইআইআর সহায়তা করতে পারে।’
রাজধানীর কয়েকটি বড় শপিং মল ঘুরে দেখা গেছে, অনেক ব্যবসায়ী দোকান খুলতে আগ্রহী হলেও একটি মহলের ভয়ে তাঁরা পিছু হটছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বসুন্ধরা সিটি ও যমুনা ফিউচার পার্কের একাধিক ব্যবসায়ী জানান, সরকার তাঁদের সব নৈতিক দাবি মেনে নিয়েছে। কিন্তু প্রভাবশালী কিছু ব্যবসায়ী নেতা ও চোরাই সিন্ডিকেটের সদস্যরা ক্রমাগত হুমকি দিচ্ছেন। তাঁদের স্পষ্ট কথা—যতক্ষণ এনইআইআর বন্ধ না হবে, ততক্ষণ কাউকে শান্তিতে ব্যবসা করতে দেওয়া হবে না।
রাজধানীর এক ব্যবসায়ী বলেন, “সরকার যদি বৈধ ও অবৈধ সব ব্যবসায়ীর জন্য ট্যাক্স সমানও করে দেয়, তাও এই চোরাকারবারিরা আন্দোলন চালিয়ে যাবে। কারণ তাদের সমস্যা ভ্যাট নিয়ে নয়, সমস্যা হলো এনইআইআর নিয়ে। এটা চালু থাকলে তারা আর ভারত বা দুবাইয়ের চোরাই ফোন এই দেশে সচল করতে পারবে না।”
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, মূলত চোরাই মোবাইল এবং ক্লোন বা নকল ফোন বিক্রি করে যে সিন্ডিকেটগুলো রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছে, তারাই এখন আন্দোলনকে ত্বরান্বিত করছে। এই সিন্ডিকেটের কারণে সাধারণ ক্রেতারা যেমন প্রতারিত হচ্ছেন, তেমনি সরকারও বছরে কয়েক হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে।
বিটিআরসি ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো পুরো বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, ডিজিটাল জালিয়াতি ও মোবাইল চুরি রোধে এনইআইআর-এর কোনো বিকল্প নেই। সাধারণ ব্যবসায়ীদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে যারা জাতীয় নিরাপত্তার এই প্রকল্প বাধাগ্রস্ত করছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
অস্ট্রেলিয়ায় হারানো বা চুরি যাওয়া ফোন সব নেটওয়ার্কে ব্লক করার জন্য একটি সেন্ট্রাল ব্যবস্থা আছে। সরকার নয় বরং অস্ট্রেলিয়ান মোবাইল টেলিকমিউনিকেশনস অ্যাসোসিয়েশন (এএমটিএ) এই ব্যবস্থা পরিচালনা করে। যুক্তরাজ্যে ফোন হারালে নেটওয়ার্ক অপারেটর আইএমইআই ব্লক করে দেয়, ফলে নতুন সিম দিয়েও সেটি ব্যবহার করা যায় না।






















