দেশে হাজার কোটি টাকার অবৈধ মোবাইল ফোন বাজার নিয়ন্ত্রণকারী সিন্ডিকেটটি এখন অস্তিত্ব রক্ষায় দিশেহারা। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিটিআরসি-র ন্যাশনাল ইক্যুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (NEIR) বা মোবাইল নিবন্ধন ব্যবস্থা বন্ধ করতে এ পর্যন্ত ৬৩ বার নিজেদের দাবি পরিবর্তন করেছে এই অসাধু ব্যবসায়ী গোষ্ঠী। তথ্য ও উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, জননিরাপত্তামূলক এই প্রকল্পকে বাধাগ্রস্ত করতে তারা একেক সময় একেক অজুহাত সামনে নিয়ে আসছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আন্দোলনের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত এই ব্যবসায়ীরা সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে যে দাবিগুলো পেশ করেছে, তার মধ্যে রয়েছে চরম বৈপরীত্য।
- শুরুতে দাবি ছিল: ভ্যাট ও ট্যাক্স কমানো।
- ট্যাক্স কমানোর পর দাবি: এনইআইআর সার্ভার বিদেশে (যা সম্পূর্ণ গুজব)।
- এরপরের দাবি: সাধারণ মানুষের গোপনীয়তা নষ্ট হওয়া (যা প্রযুক্তিগতভাবে অসম্ভব)।
- বর্তমান অবস্থান: নতুন নতুন কারিগরি অজুহাত দিয়ে এনইআইআর চালুর সময়সীমা পিছিয়ে দেওয়া।
বিশ্লেষকদের মতে, এই যে ৬৩ বার দাবিনামা পরিবর্তন করা হলো, তার মূল উদ্দেশ্য ছিল সময়ক্ষেপণ করা। যাতে এই সময়ের মধ্যে তারা কয়েক হাজার কোটি টাকার অবৈধ স্টক বাজারে খালাস করে দিতে পারে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ব্যবসায়ী স্বীকার করেছেন, “আমাদের দাবি মূলত এনইআইআর বাতিল করা। এনইআইআর না হলে আমার ব্যবহৃত (সেকেন্ড হ্যান্ড) ফোনের ব্যবসা করতে পারব না, কারণ আমার লাভের ৯০ শতাংশই আসে এই ফোনগুলো থেকে।”
তদন্তে দেখা গেছে, যখনই সরকার বা বিটিআরসি তাদের একটি দাবি মেনে নিচ্ছে বা যৌক্তিকভাবে খণ্ডন করছে, তখনই তারা নতুন একটি ‘ইস্যু’ তৈরি করছে। মূলত চুরির ফোন, রিফারবিশড সেট এবং ভারত থেকে আসা ৫০ শতাংশ অবৈধ ফোনের বাজার টিকিয়ে রাখতেই এই লুকোচুরি খেলা চলছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বসুন্ধরা সিটি ও রিয়াজউদ্দিন বাজারের একাধিক ব্যবসায়ী জানান, তাঁরা এখন এই বারংবার দাবি পরিবর্তনের রাজনীতিতে ক্লান্ত। তারা বলেন, “সরকার আমাদের ভ্যাট-ট্যাক্স কমানোর দাবি মেনে নিয়েছে। আমরা এখন শান্তিতে ব্যবসা করতে চাই। কিন্তু সিন্ডিকেট নেতারা আমাদের দোকান খুলতে বাধা দিচ্ছে এবং একেক সময় একেক দাবি শিখিয়ে দিচ্ছে। তারা মূলত এনইআইআর বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত আমাদের জিম্মি করে রাখতে চায়।”
সরকার দাবি মানার পর অনেক সাধারণ ব্যবসায়ী দোকান খুলতে চাইলেও সিন্ডিকেট নেতাদের হুমকিতে তারা ফিরতে পারছেন না। অনেক ব্যবসায়ীর অভিযোগ, এনইআইআর বন্ধের আন্দোলনে অংশ নিতে বড় বড় মার্কেট থেকে বিপুল পরিমাণ চাঁদা তোলা হয়েছে। সিন্ডিকেট নেতারা এখন দোকান বন্ধ রেখে সরকারকে ব্ল্যাকমেইল করার চেষ্টা করছেন যাতে ডিজিটাল নিরাপত্তার এই বড় প্রকল্পটি বন্ধ হয়ে যায়।
তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ফাহিম মাশরুর ও সুমন আহমেদ সাবির মনে করেন, এই ৬৩ বার দাবি পরিবর্তনের ঘটনাটিই প্রমাণ করে যে, এই আন্দোলনের কোনো নির্দিষ্ট নীতি বা আদর্শ নেই। এটি কেবল ৯৬ হাজার কোটি টাকার একটি অবৈধ সাম্রাজ্য রক্ষার মরিয়া চেষ্টা। ডিজিটাল জালিয়াতির ৮৫ শতাংশই যখন অবৈধ ফোনে ঘটছে, তখন এই সিন্ডিকেটের অযৌক্তিক দাবির কাছে নতি স্বীকার করা হবে আত্মঘাতী।
প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব সাফ জানিয়েছেন, সরকার কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর অযৌক্তিক চাপে নতি স্বীকার করবে না। যে ৮৮ লাখ সিম বন্ধ হয়েছে এবং এনইআইআর ব্যবস্থা যা চালু হতে যাচ্ছে, তা জাতীয় নিরাপত্তার অংশ। দাবি পরিবর্তনের নাটক করে রাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ জানানো হলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।






















