বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইন-২০০১ অনুযায়ী ২০০২ সালের ৩১ জানুয়ারি যাত্রা শুরু করেছিল স্বাধীন কমিশন বিটিআরসি। সেই হিসেবে গতকাল শনিবার নিজস্ব ঠিকানায় ঘরোয়া পরিবেশে ২৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করল সংস্থাটি। তবে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই শান্ত আবহের আড়ালে বিটিআরসি ভবনে বইছে দমকা হাওয়া। প্রযুক্তির দুই দশকের সাফল্যের মুকুট মাথায় থাকলেও স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং অভ্যন্তরীণ শুদ্ধি অভিযানের তীব্র দাবিতে এক কঠিন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে এই রেগুলেটরি বডি।
সাফল্য বনাম শ্বেতপত্রের কলঙ্ক
বিটিআরসির হাত ধরেই দেশে ৫জি-র ট্রায়াল এবং সাবমেরিন ক্যাবলের সক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু সম্প্রতি প্রকাশিত সরকারি ‘শ্বেতপত্র’ সংস্থাটির অন্ধকার দিক উন্মোচন করেছে। শ্বেতপত্রের তথ্য অনুযায়ী, বিগত বছরগুলোতে নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে প্রভাব খাটিয়ে নির্দিষ্ট কিছু গোষ্ঠীকে অনৈতিক সুবিধা দেওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক বিবেচনায় অযোগ্য প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স প্রদান এবং অবকাঠামো উন্নয়নের নামে বিশাল অঙ্কের অর্থের অস্বচ্ছ ব্যবহারের প্রমাণ মিলেছে। মেধাবীদের সরিয়ে প্রভাবশালীদের ঘনিষ্ঠদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর দালিলিক প্রমাণও এখন জনসমক্ষে।
সংস্কারের গোলকধাঁধায় বিটিআরসি
বিটিআরসি এখন আর কেবল লাইসেন্স দেওয়ার কোনো ‘ডাকঘর’ নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তার অতন্দ্র প্রহরী। তবে বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বিটিআরসির আসল কাজ হওয়া উচিত একটি সুস্থ ও প্রতিযোগিতামূলক বাজার তৈরি করা। এরই অংশ হিসেবে ‘ওয়ান নেশন, ওয়ান লাইসেন্স’ নীতিতে সেবার ধরন অনুযায়ী লাইসেন্স একীভূত করার কাজ চলছে। প্রভাবশালী সিন্ডিকেট ভাঙতে বিগত দিনে রাজনৈতিক বিবেচনায় দেওয়া কয়েকশ অকার্যকর আইএসপি লাইসেন্স বাতিলের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
এনইআইআর ও তরঙ্গ নিয়ে অসন্তোষ
অবৈধ হ্যান্ডসেট বন্ধে এনইআইআর (NEIR) চালু করা বিটিআরসির জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ। শুল্ক ফাঁকি রোধে কঠোর অবস্থান নিতে গিয়ে সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এমনকি উৎপাদক বনাম গ্রে-ইম্পোর্টার বিরোধের জেরে বিটিআরসি ভবন পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছে। অন্যদিকে, তরঙ্গ বা স্পেকট্রাম বরাদ্দে অতীতে গড়িমসি এবং উচ্চমূল্যের খেসারত দিচ্ছে সাধারণ গ্রাহক কল ড্রপ ও ধীরগতির ইন্টারনেটের মাধ্যমে। ২০২৬ সালের মধ্যে ৫জি-র পূর্ণাঙ্গ প্রসারে নতুন তরঙ্গ নিলামের পরিকল্পনা থাকলেও অপারেটরদের তুষ্ট করা এখন বড় পরীক্ষা।
প্রত্যাশা ও শুদ্ধি অভিযান
শ্বেতপত্রের সুপারিশ মেনে বিটিআরসির ভেতরে দীর্ঘদিনের ‘মরিচা’ পরিষ্কারের সময় এসেছে। টেলিকম মনিটরিং সিস্টেমের মতো বড় প্রকল্পে কেন ব্যয় কয়েকগুণ বাড়ানো হলো, তার পুঙ্খানুপুঙ্খ নিরীক্ষা এখন সময়ের দাবি। অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের সরিয়ে প্রশাসনকে ঢেলে সাজানোর প্রক্রিয়া শুরু হলেও তা এখনও পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। সর্বশেষ কমিশন বৈঠকে এসব ইস্যু উপেক্ষিত হওয়ার অভিযোগে সংস্থাটি এখন এক ধরণের একাকীত্বের মধ্য দিয়ে সময় পার করছে।
আগারগাঁওয়ের বিটিআরসি ভবনে আজকের যে নিস্তব্ধতা, সাধারণ মানুষ আশা করে এটি যেন কোনো বড় ইতিবাচক পরিবর্তনের আগের নীরবতা হয়। দুর্নীতিমুক্ত হয়ে স্বচ্ছতার পথে হাঁটলেই কেবল প্রকৃত ‘ডিজিটাল সাম্য’ প্রতিষ্ঠা সম্ভব।





















