২০১১ সালে যখন টেলিফোন শিল্প সংস্থা (টশশ) দেশের বাজারে ‘দোয়েল’ ল্যাপটপ নিয়ে আসে, তখন সাধারণ মানুষের মধ্যে এক নতুন আশার সঞ্চার হয়েছিল। সবাই ভেবেছিলেন, এবার সাশ্রয়ী মূল্যে হাতে আসবে প্রযুক্তির সেরা হাতিয়ার। কিন্তু সেই স্বপ্ন ডানা মেলার আগেই মুখ থুবড়ে পড়ে। কেন বন্ধ হয়ে গেল এই বিশাল প্রজেক্ট? চলুন জেনে নেওয়া যাক দোয়েল ল্যাপটপের ব্যর্থতার আসল নেপথ্য কাহিনী।
যেভাবে শুরু হয়েছিল যাত্রা
স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের হাতে স্বল্পমূল্যে ল্যাপটপ পৌঁছে দিতে বিটিসিএল থেকে ৪৫ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে যাত্রা শুরু করে টশশ। এতে সহযোগী ছিল টু-এম কর্পোরেশন এবং মালয়েশিয়ার টিএফটি টেকনোলজি। শুরুতে মাত্র ১০% যন্ত্রাংশ দেশে তৈরি হলেও লক্ষ্য ছিল একে ৬০%-এ উন্নীত করা।
ল্যাপটপের মডেল ও কনফিগারেশন
দোয়েল বাজারে চারটি মডেল নিয়ে আসে:
মডেল ২১০২ (১০ হাজার টাকা): যা ছিল সবচেয়ে কম দামি, কিন্তু অত্যন্ত দুর্বল কনফিগারেশনের (৮০০ মেগাহার্টজ প্রসেসর ও ৫১২ এমবি র্যাম)।
মডেল ০৭০৩ (১৩,৫০০ টাকা): এটি ছিল কিছুটা উন্নত, যেখানে অ্যাটম প্রসেসর ও ১ জিবি র্যাম ব্যবহার করা হয়েছিল।
উচ্চবিত্ত মডেল: পরবর্তী মডেলগুলোর দাম ছিল যথাক্রমে ২২ হাজার ও ২৬ হাজার টাকা।
ব্যর্থতার প্রধান ৫টি কারণ
১. মানের সাথে আপস: কম দাম রাখতে গিয়ে প্রসেসর, র্যাম ও ব্যাটারির গুণমান ছিল অত্যন্ত নিম্নমানের। ২০১৪ সালের এক গবেষণায় দেখা যায়, ৮৩% ব্যবহারকারী ব্যাটারি নিয়ে এবং ৩৫% র্যাম নিয়ে অভিযোগ করেছিলেন।
২. অংশীদারদের প্রস্থান: প্রজেক্ট শুরু করার মাত্র এক বছর পরেই ৭৫% মালিকানার অংশীদার টু-এম কর্পোরেশন ও টিএফটি প্রজেক্ট থেকে সরে দাঁড়ায়। টিএফটি-এর পাওনা দাবি নিয়ে জটিলতা তৈরি হওয়ায় প্রোডাকশন ম্যানেজমেন্ট ভেঙে পড়ে।
৩. চাহিদাহীন কনফিগারেশন: দুর্বল স্পেসিফিকেশনের কারণে সাধারণ মানুষ এই ল্যাপটপ কেনেনি। দুই বছরে মাত্র ২৮,৬২২টি ল্যাপটপ বিক্রি হয়, যার বড় অংশই (১৭,৮১৫টি) কিনেছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়। অবাক করা বিষয় হলো, ১০ হাজার টাকার মডেলটি বিক্রি হয়েছিল মাত্র ৯৮টি!
৪. আফটার সেল সার্ভিস ও টেকসইহীনতা: দোয়েল ল্যাপটপ কেনার পর কোনো বিক্রয়োত্তর সেবা পাওয়া যেত না। যন্ত্রাংশগুলো টেকসই না হওয়ায় দ্রুত নষ্ট হয়ে যেত, যা ক্রেতাদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি করে।
৫. অর্থনৈতিক সংকট: বিটিসিএল-এর ঋণের বোঝা এবং নতুন অর্থায়নের অভাবে ২০১৬ সালে প্রজেক্টটি সাময়িকভাবে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
দ্বিতীয় ইনিংস: দোয়েলের ফিরে আসার চেষ্টা
২০১৯ সালে দোয়েল আবার নতুন উদ্যমে ফেরার ঘোষণা দেয়। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে তারা প্রায় ১৩,৮২৫টি ল্যাপটপ বিক্রি করে এবং দেশব্যাপী ২০টি শোরুম খোলার পরিকল্পনা নেয়। ৪২ হাজার টাকায় তারা নিয়ে আসে কোর আই-ফাইভ (৬ষ্ঠ প্রজন্ম) প্রসেসরের ল্যাপটপ।
বিশেষজ্ঞের অভিমত: টিকে থাকার চ্যালেঞ্জ
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বাজারে লেনোভো, এইচপি বা শাওমির মতো ব্র্যান্ডের সাথে টিকতে হলে দোয়েলকে অবশ্যই ‘ব্যাকডেটেড’ প্রযুক্তির গণ্ডি থেকে বের হতে হবে। এইচডিডি-র বদলে এসএসডি এবং সর্বশেষ প্রজন্মের প্রসেসর ব্যবহার না করলে মানুষের মনের পুরনো নেতিবাচক ধারণা দূর করা কঠিন হবে। দোয়েল যদি সত্যিই ফিরে আসতে চায়, তবে তাদের তকমা কেবল ‘দেশি’ হলে চলবে না, মানের দিক থেকেও ‘বিশ্বমানের’ হতে হবে।






















