অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পর মানুষ আবার চাঁদের পথে ফিরেছে। আজ বৃহস্পতিবার ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে শক্তিশালী স্পেস লঞ্চ সিস্টেম রকেটে চড়ে চার নভোচারীকে বহনকারী ওরিয়ন মহাকাশযান যাত্রা শুরু করেছে। ১৯৭২ সালে অ্যাপোলো যুগের সমাপ্তির পর এটিই প্রথম মানববাহী মিশন, যা পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথ পেরিয়ে চাঁদের পথে যাচ্ছে।
এ যাত্রা সরাসরি চাঁদে নামার নয়। বরং চাঁদের চারপাশ ঘুরে আবার পৃথিবীতে ফিরে আসা। উৎক্ষেপণের প্রায় ছয় দিনের মাথায়, অর্থাৎ ৬ এপ্রিলের দিকে ওরিয়ন চাঁদের কাছাকাছি পৌঁছানোর কথা। সেখানে গিয়ে মহাকাশযানটি চাঁদের মাধ্যাকর্ষণ ব্যবহার করে একটি ‘ফ্রি-রিটার্ন’ পথে ঘুরে আসবে, যাতে কোনো জরুরি পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত জ্বালানি ছাড়াই পৃথিবীতে ফিরে আসা সম্ভব হয়। পুরো মিশনের সময়কাল ধরা হয়েছে ১০ দিন, যার সমাপ্তি হবে ১০ এপ্রিল প্রশান্ত মহাসাগরে অবতরণের মাধ্যমে।
যাত্রার শুরুটা মোটেই আনুষ্ঠানিক নয়; বরং বেশ জটিল পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে। প্রথম এক থেকে দুই দিন নভোচারীরা পৃথিবীর উচ্চ কক্ষপথে থেকে ওরিয়নের প্রতিটি সিস্টেম পরীক্ষা করবেন। জীবনরক্ষা ব্যবস্থা, যোগাযোগ, ন্যাভিগেশন—সবকিছু ঠিকঠাক কাজ করছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়ার পরই শুরু হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ—ট্রান্সলুনার ইনজেকশন। এ প্রক্রিয়ায় মহাকাশযানটি পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ ছাড়িয়ে সরাসরি চাঁদের পথে ধাবিত হবে।
পরবর্তী দুই দিন চাঁদের দিকে যাত্রা চলতে থাকবে গভীর মহাকাশে। এই সময় নভোচারীরা কেবল যাত্রী নন; তারা গবেষকও। তারা মহাকাশযানের বিভিন্ন ডেটা পর্যবেক্ষণ করবেন, পরিবেশগত পরিবর্তন নথিভুক্ত করবেন এবং মানবদেহের ওপর মহাকাশের প্রভাব নিয়ে পরীক্ষা চালাবেন। পৃথিবী থেকে ক্রমশ দূরে সরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থাও পরীক্ষা করবেন। যা ভবিষ্যতের দীর্ঘমেয়াদি মিশনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পঞ্চম দিনে ওরিয়ন প্রবেশ করবে চাঁদের মাধ্যাকর্ষণ বলয়ের মধ্যে, যেখানে পৃথিবীর টান অপেক্ষাকৃত দুর্বল হয়ে পড়ে। এ পর্যায়ে নভোচারীরা তাদের স্পেসস্যুট পরীক্ষা করবে। দ্রুত পরিধান, চাপ নিয়ন্ত্রণ, জরুরি অবস্থায় ব্যবহারের সক্ষমতা সবকিছুই বাস্তব পরিস্থিতির মতো করে যাচাই করা হবে। কারণ ভবিষ্যতের চাঁদে অবতরণ মিশনে এই দক্ষতাগুলোই জীবনরক্ষাকারী হয়ে উঠবে।
মিশনের ষষ্ঠ দিনটি সবচেয়ে প্রতীক্ষিত। এদিন ওরিয়ন চাঁদের পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৬,৪৫০ থেকে ৯,৬৫০ কিলোমিটার দূর দিয়ে উড়ে যাবে। এ মুহূর্তে নভোচারীরা সরাসরি চাঁদের দৃশ্য দেখবেন। যা গত পাঁচ দশকে কোনো মানুষ দেখেনি এত কাছ থেকে। তারা ছবি তুলবেন, তথ্য সংগ্রহ করবেন এবং চাঁদের কক্ষপথে মহাকাশযানের আচরণ পর্যবেক্ষণ করবেন।
এরপর শুরু হবে পৃথিবীতে ফেরার দীর্ঘ পথ। যা সপ্তম থেকে নবম দিন পর্যন্ত বিস্তৃত। এ সময় মহাকাশযানটি একই ‘ফ্রি-রিটার্ন’ পথে পৃথিবীর দিকে এগিয়ে আসবে। নভোচারীরা বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা চালাবেন। বিশেষ করে মানবদেহের ওপর গভীর মহাকাশের প্রভাব নিয়ে। হৃদস্পন্দন, রেডিয়েশন এক্সপোজার, মানসিক চাপ—এসব বিষয় নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে। ভবিষ্যতে চাঁদে দীর্ঘদিন থাকা বা মঙ্গলগ্রহে যাওয়ার পরিকল্পনার জন্য এই তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
দশম দিনে মিশনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ধাপ—পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে পুনঃপ্রবেশ। ওরিয়ন তখন ঘণ্টায় প্রায় ৪০ হাজার কিলোমিটার গতিতে প্রবেশ করবে, যার ফলে তাপমাত্রা ভয়াবহভাবে বেড়ে যায়। এই সময় মহাকাশযানের হিট শিল্ডের কার্যকারিতা পরীক্ষা হবে। এরপর প্যারাশুটের সাহায্যে ধীরে ধীরে প্রশান্ত মহাসাগরে অবতরণ করবে ক্যাপসুলটি, যেখানে উদ্ধারকারী দল অপেক্ষা করে থাকে।


















