দেশের ফ্রিল্যান্সিং খাতের দীর্ঘদিনের দাবি অনলাইন পেমেন্ট গেটওয়ে ‘পেপ্যাল’ এবং অবৈধ মোবাইল হ্যান্ডসেট বন্ধে ‘এনইআইআর’ (NEIR) ব্যবস্থা চালুর বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমল থেকে শুরু করে পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকার হয়ে বর্তমানে বিএনপি সরকারও পেপ্যাল চালুর কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার কথা বললেও বাস্তবে তার প্রতিফলন এখনো দেখা যায়নি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বৈশ্বিক এই সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক নীতিমালার সঙ্গে দেশের প্রচলিত আইনের সমন্বয় এবং কারিগরি প্রস্তুতির অভাবই এই দীর্ঘসূত্রতার প্রধান কারণ।
পেপ্যাল: আশার বাণী বনাম বাস্তবতা
বাংলাদেশে ফ্রিল্যান্সিং করে আয় করা কয়েক লাখ তরুণের জন্য অর্থের সহজ ও দ্রুত লেনদেনের প্রধান ভরসা পেপ্যাল। দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময় ধরে বিভিন্ন সরকার এটি বাংলাদেশে আনার প্রতিশ্রুতি দিলেও এখনো তা বাস্তবায়িত হয়নি।
বর্তমানে বিএনপি সরকারের পক্ষ থেকে পেপ্যাল চালুর কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। তবে ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, পেপ্যালের নিজস্ব কিছু শর্ত থাকে, যার মধ্যে অন্যতম হলো অবাধে বৈদেশিক মুদ্রা দেশের বাইরে পাঠানো ও ভেতরে আনার সুযোগ। বাংলাদেশের বর্তমান ডলার সংকট এবং মানি লন্ডারিং প্রতিরোধের কঠোর আইন অনেক ক্ষেত্রেই পেপ্যালের ব্যবসায়িক মডেলের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়ায়।
এর আগে পেপ্যাল তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ‘জুম’-এর মাধ্যমে বাংলাদেশে সেবা চালু করলেও পূর্ণাঙ্গ পেপ্যাল সেবা চালুর বিষয়ে বারবার পিছু হটেছে। প্রতিষ্ঠানটি মনে করে, বাংলাদেশের বাজার এখনো তাদের জন্য পুরোপুরি লাভজনক বা ঝুঁকিমুক্ত নয়।
এনইআইআর: দোটানায় বিটিআরসি
একইভাবে গত কয়েক বছর ধরে দফায় দফায় সময় দিয়েও পুরোপুরি কার্যকর করা যায়নি ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার বা এনইআইআর ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থাটি চালু হলে দেশে অবৈধভাবে আসা বা নকল মোবাইল ফোন ব্যবহারের সুযোগ বন্ধ হয়ে যাবে।
সূত্র জানায়, কারিগরিভাবে সিস্টেমটি প্রস্তুত থাকলেও গ্রাহক পর্যায়ে বড় ধরণের নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কায় এটি বাস্তবায়ন করতে পারছে না সরকার। বর্তমানে দেশে কয়েক কোটি ব্যবহারকারী ‘গ্রে-মার্কেট’ বা অবৈধ পথে আসা ফোন ব্যবহার করছেন। এনইআইআর পুরোপুরি কার্যকর করলে একযোগে কয়েক কোটি হ্যান্ডসেট বন্ধ হয়ে যেতে পারে, যা বড় ধরণের জনঅসন্তোষ তৈরি করার ঝুঁকি রাখে। এছাড়া প্রবাসীদের আনা ব্যক্তিগত হ্যান্ডসেট নিবন্ধনের প্রক্রিয়া সহজ না হওয়াও একে পিছিয়ে দেওয়ার অন্যতম কারণ।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল রাজনৈতিক সদিচ্ছা দিয়ে পেপ্যালের মতো প্রতিষ্ঠানকে দেশে আনা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন ব্যাংকিং নীতিমালায় বড় ধরণের সংস্কার। অন্যদিকে, এনইআইআর কার্যকরের ক্ষেত্রে সাধারণ গ্রাহককে ভোগান্তিতে না ফেলে পর্যায়ক্রমে ডাটাবেজ সমৃদ্ধ করার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
বর্তমানে প্রযুক্তি খাতের উদ্যোক্তা ও ফ্রিল্যান্সাররা সরকারের নতুন উদ্যোগের দিকে তাকিয়ে আছেন। তারা মনে করেন, যথাযথ নীতি সহায়তা এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জোরালো কূটনৈতিক তৎপরতা চালানো গেলে এবার হয়তো দীর্ঘদিনের এই প্রতীক্ষার অবসান ঘটতে পারে।



















