রাজধানীর যমুনা ফিউচার পার্কের মোবাইল ফোনের বাজারটি প্রিমিয়াম হ্যান্ডসেট, বিশেষ করে আইফোন (iPhone) ক্রয়ের জন্য ক্রেতাদের অন্যতম প্রধান পছন্দ। কিন্তু চকচকে শোরুম আর মিষ্টি কথার আড়ালে এখানকার কিছু অসাধু বিক্রেতা কীভাবে গ্রাহকদের প্রতারণার জালে ফেলছেন, তার এক চাঞ্চল্যকর চিত্র সামনে এসেছে। ‘ব্যাটারি বুস্ট’ করে ভুয়া হেলথ দেখানো, আগেই খোলা এবং নষ্ট ডিসপ্লে আঠা দিয়ে জোড়াতালি দিয়ে ‘একদম ফ্রেশ’ বলে গ্রাহকদের কাছে লাখ টাকায় ফোন বিক্রি করার একাধিক গুরুতর অভিযোগ উঠেছে যমুনা ফিউচার পার্কের ‘অ্যাপল ক্লাব’ (APPLE CLUB) নামক একটি দোকানের বিরুদ্ধে।
ভুক্তভোগী গ্রাহকদের লিখিত অভিযোগ, অতীতের নজির এবং এই নিয়ে তৈরি হওয়া তুমুল বিতর্কের বিস্তারিত বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলো:
শেখ সাদি নামের এক ভুক্তভোগী গ্রাহক প্রায় ১০ মাস আগে যমুনা ফিউচার পার্কের ‘অ্যাপল ক্লাব’ থেকে একটি প্রিমিয়াম ফোন কেনেন। কেনার সময় বিক্রেতারা তাকে আশ্বস্ত করে জোর গলায় বারবার বলেছিল, “ভাই, ফোন একদম ফ্রেশ, আজ পর্যন্ত একবারের জন্যও খোলা হয় নাই।” বিক্রেতাদের মুখের কথায় বিশ্বাস করে পুরো টাকা পরিশোধ করে ফোনটি কেনেন তিনি।
কিন্তু ফোনটি কেনার পর দুই মাসও ঠিকমতো ব্যবহার করতে পারেননি সাদি। হঠাৎ করেই এর ডিসপ্লেতে ‘গ্রিন লাইন’ (সবুজ দাগ) চলে আসে এবং ধীরে ধীরে লাইনের সংখ্যা বাড়তে থাকে। বাধ্য হয়ে ফোনটির ডিসপ্লে পরিবর্তন করার জন্য তিনি যখন একটি বিশ্বস্ত এবং পেশাদার সার্ভিস সেন্টারে যান, তখন ফোনের ভেতরের আসল কঙ্কালসার চেহারা দেখে তার চোখ কপালে ওঠার অবস্থা হয়।
সার্ভিস সেন্টার থেকে নিশ্চিত করা হয় যে:
ফোনটি বিক্রি করার আগেই বহুবার খোলা হয়েছিল।
বাইরে থেকে যেন বোঝা না যায়, সেজন্য ফোনের ভেতরে প্রচুর আঠা (Glue) দিয়ে ডিসপ্লেটি কোনোমতে আটকে রাখা হয়েছিল।
সবচেয়ে মারাত্মক জালিয়াতি করা হয়েছিল ব্যাটারি নিয়ে। ফোনের ব্যাটারিটি আসল ছিল না, বরং বিশেষ ডিভাইসের মাধ্যমে ‘Battery Boost’ করে এর হেলথ (Health) কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে রাখা হয়েছিল, যা খালি চোখে সাধারণ ক্রেতাদের পক্ষে বোঝা অসম্ভব।
ক্ষোভ প্রকাশ করে শেখ সাদি বলেন, “যমুনা ফিউচার পার্কের বাটপার বিক্রেতাদের খপ্পরে পড়ে কেউ যেন কষ্টের টাকা না হারান। একদিকে নষ্ট ফোন গছিয়ে দিলো, অন্যদিকে মিথ্যা কথা বলে পকেট কাটলো।”
যমুনা ফিউচার পার্কের এই নির্দিষ্ট চক্রের হাতে প্রতারিত হওয়ার ঘটনা এটিই প্রথম নয়। এর আগে আনিকা নওরিন নামে এক নারী গ্রাহক একই শোরুম থেকে আইফোন ১৪ প্রো (iPhone 14 Pro) কিনতে গিয়ে হুবহু একই ধরনের জালিয়াতির শিকার হয়েছিলেন। নামী মার্কেটের নাম ভাঙিয়ে এভাবে একের পর এক ‘রিফারবিশড’ বা জোড়াতালি দেওয়া ফোন ফ্রেশ হিসেবে বিক্রি করায় ক্ষুব্ধ সাধারণ ক্রেতারা।
শেখ সাদির এই অভিযোগ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর গ্রাহক ও নেটিজেনদের মধ্যে তীব্র বিতর্ক ও মন্তব্যের ঝড় উঠেছে। এই জালিয়াতির সপক্ষে ও বিপক্ষে একাধিক গ্রাহকের মন্তব্য নিচে তুলে ধরা হলো:
এমডি ফরিদ ইসলাম পলক (MD Forid Islam Polok)-এর সংশয় ও প্রশ্ন: এই ঘটনার প্রেক্ষিতে ফরিদ ইসলাম পলক নামের একজন গ্রাহক যুক্তি দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেন, “ফোনে যখন গ্রিন লাইন পড়ে, তখন আমাকে বলা হয়েছিল ফোন পরিবর্তন করে দেওয়া হবে, না হলে টাকা ফেরত দেওয়া হবে। এটা কি সত্যিই সম্ভব? এরপর তিনি (অভিযোগকারী) বললেন, ‘আমি এর মজা বুঝাবো।’ তারপর থেকে আর কোনো খবর নেই। ঈদের কিছুদিন আগে তিনি বলেছিলেন, ‘ভাই, ফোনের ব্যাটারি হেলথ কমছে না কেন?’ আর এখন বলছেন ফোন বুস্ট করা। আমার প্রশ্ন হলো, যদি সত্যিই ফোন বুস্ট করা হয়ে থাকে, তাহলে ব্যাটারি হেলথ কি ১%ও কমতো না?” * আরিফুর রহমান (অন্য একজন নিয়মিত ক্রেতা): “যমুনা ফিউচার পার্কের সিংহভাগ দোকানদারই এখন চোর। তারা দুবাই বা সিঙ্গাপুর থেকে আনা ‘লক’ বা ‘রিপেয়ারড’ ফোন এনে সফটওয়্যার দিয়ে ব্যাটারি ১০০% শো করিয়ে ‘ইউজড ফ্রেশ’ বলে বিক্রি করে। কাস্টমার কেনার ২-৩ মাস পর আসল রূপ বের হয়।”
তাসনিম আহমেদ (আইফোন ব্যবহারকারী): “আইফোনের ব্যাটারি বুস্ট করা ১০০% সম্ভব। চাইনিজ কিছু ডিভাইস আছে যা দিয়ে ব্যাটারির সাইকেল কাউন্ট (Cycle Count) শূন্য করে হেলথ বাড়িয়ে দেওয়া যায়। ফোন কেনার সময় থ্রিইউ টুলস (3uTools) দিয়ে চেক করলেও অনেক সময় এই জালিয়াতি ধরা পড়ে না, যদি না ফোনটি অভিজ্ঞ টেকনিশিয়ান দিয়ে খোলানো হয়।”
ইশতিয়াক চৌধুরী: “দোকানিরা বিক্রির সময় ৫ দিনের রিপ্লেসমেন্ট আর ১ বছরের সার্ভিসের কথা বলে কাস্টমার পটায়। কিন্তু সমস্যা নিয়ে গেলে উল্টো কাস্টমারের ওপর দোষ চাপায় যে— ‘আপনার হাত থেকে ফোন পড়েছে’ বা ‘পানি ঢুকেছে’। যমুনা ফিউচার পার্কের এই অ্যাপল ক্লাবের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।”
মোবাইল ফোনের বাজারে এমন অভিনব জালিয়াতি এবং চোরাই বা মাস্টার কপি ফোনকে ‘ব্র্যান্ড নিউ’ বা ‘আন-ওপেনড’ বলে বিক্রি করা বাংলাদেশের ‘জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর’ (DNCRP) এর আইন অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধ।


















