কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার করে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ডলার হাতিয়ে নেওয়ার এক বিশাল আন্তর্জাতিক জালিয়াতি চক্রের সন্ধান মিলেছে। নিজস্ব এআই মডেল ‘জেমিনি’ ব্যবহার করে এই স্ক্যাম চালানোর অভিযোগে চীনের একটি সাইবার অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে মার্কিন আদালতে মামলা করেছে টেক জায়ান্ট গুগল। গত শুক্রবার এক বিজ্ঞপ্তিতে গুগল এই আইনি পদক্ষেপের কথা জানায়।
এই আন্তর্জাতিক চক্রটিকে নির্মূল করতে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই এবং যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ তিনটি মোবাইল অপারেটর—এটিঅ্যান্ডটি, টি-মোবাইল ও ভেরাইজানের সাথে যৌথভাবে কাজ করছে গুগল। গুগলের জেনারেল কাউন্সেল ডিলেইন প্রাডো জানান, বিশ্বজুড়ে এই জালিয়াতি কতটা বড় পরিসরে আঘাত হেনেছে, তা এই সমন্বিত যৌথ প্রচেষ্টা ও মামলা থেকেই স্পষ্ট।
যেভাবে পাতা হতো ফাঁদ
আদালতে দায়ের করা মামলায় গুগল ‘আউটসাইডার এন্টারপ্রাইজ’ নামের চীনের একটি আন্ডারগ্রাউন্ড অপরাধী সংস্থাকে অভিযুক্ত করেছে। চক্রটি গুগলের প্রযুক্তি ও ব্র্যান্ড নাম ব্যবহার করে প্রতারণা চালাচ্ছিল। নেটওয়ার্কটি পুরোপুরি বন্ধে আদালতের কাছে জরুরি নিষেধাজ্ঞার অনুরোধ জানিয়েছে গুগল।
তদন্তে দেখা গেছে, হ্যাকাররা জেমিনি এআই ব্যবহার করে অত্যন্ত নিখুঁত ও বিশ্বাসযোগ্য ভাষায় টেক্সট এবং গুগল, ইউটিউব, মার্কিন ডাক বিভাগ ও নিউ ইয়র্কের টোল সেবা ‘ই-জেডপাস’-এর হুবহু নকল ওয়েবসাইট তৈরি করত। তবে জেমিনির নিরাপত্তা দেয়াল ভেঙে হ্যাকাররা কীভাবে এই জালিয়াতি করল, তা কৌশলগত কারণে প্রকাশ করেনি গুগল।
দুই সপ্তাহে লাখ লাখ ভিকটিম
গুগলের তথ্য অনুযায়ী, এই একক স্ক্যাম অপারেশনের মাধ্যমে ইতিমধ্যে কয়েক লক্ষ মানুষ প্রতারণার শিকার হয়েছেন এবং আর্থিক ক্ষতি কয়েক মিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। এই অপরাধী চক্রটির ভয়াবহতার কিছু চিত্র নিচে দেওয়া হলো:
৯,০০০ ভুয়া ওয়েবসাইট: গুগলের চোখ ফাঁকি দিয়ে তারা ৯ হাজারের বেশি ভুয়া ওয়েবসাইট এবং ১০ লাখের বেশি প্রতারণামূলক ইউআরএল তৈরি করেছে।
২৫ লাখ ক্ষতিকর মেসেজ: মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যে তারা ২৫ লাখের বেশি ক্ষতিকর লিংকযুক্ত মেসেজ পাঠিয়েছে।
৫৫,০০০ স্প্যাম ফ্ল্যাগ: অ্যান্ড্রয়েড ব্যবহারকারীদের স্প্যাম প্রোটেকশন সিস্টেমে এই চক্রের পাঠানো অন্তত ৫৫ হাজার টেক্সট মেসেজ ‘বিপজ্জনক স্প্যাম’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
এআই স্ক্যাম রুখতে নতুন আইনের প্রস্তাব
গুগল সতর্ক করে জানিয়েছে, এআই অপরাধীদের সক্ষমতাকে কতটা শক্তিশালী করে তুলেছে তা এই ঘটনা প্রমাণ করে। এই ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে গুগল মার্কিন কংগ্রেসে দ্বিপক্ষীয় সমর্থনে অন্তত ৭টি নতুন আইন পাসের জন্য জোর লবিং চালাচ্ছে। এর মধ্যে ‘ন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজি ফর কমব্যাটিং স্ক্যামস অ্যাক্ট’ এবং প্রবীণদের সুরক্ষায় ‘স্টপ স্ক্যামস এগেইনস্ট সিনিয়ার্স অ্যাক্ট’ উল্লেখযোগ্য।
যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়ার কংগ্রেসম্যান ব্রায়ান ফিটজপ্যাট্রিক এই পদক্ষেপকে সমর্থন করে বলেন, এটি ফোনের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি সুসংগঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ। একে রুখতে প্রতিরোধ ব্যবস্থাও আগ্রাসী হওয়া দরকার। এফবিআই-এর অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর ব্রেট লেদারম্যান যোগ করেন, অপরাধীরা জালিয়াতিকে আরও বাস্তবসম্মত করতে এআই-এর আশ্রয় নিচ্ছে। এদের দমনে একটি স্থায়ী আন্তর্জাতিক আইনি সমাধান প্রয়োজন।





















