স্মার্টফোন জগতের অন্যতম জনপ্রিয় ব্র্যান্ড ওয়ানপ্লাস (OnePlus) আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের বাজার থেকে ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে অঞ্চল দুটিতে ওয়ানপ্লাসের নতুন কোনো স্মার্টফোন বা প্রযুক্তি পণ্য আর উন্মোচিত হবে না।
প্রযুক্তি বাজারে ওয়ানপ্লাসের এই প্রস্থানকে অ্যান্ড্রয়েড ইকোসিস্টেমের জন্য একটি বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। অবশ্য গত কয়েক মাস ধরেই এমন একটি আভাস পাওয়া যাচ্ছিল। চলতি বছরের জানুয়ারিতে ওয়ানপ্লাস তাদের দুটি বহুল প্রতীক্ষিত ফোনের বৈশ্বিক উন্মোচন বাতিল করে। এছাড়া সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ওয়ানপ্লাসের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটগুলোও ক্রেতাদের পরোক্ষভাবে তাদের মূল প্রতিষ্ঠান ‘ওপো’ (Oppo)-এর দিকে ধাবিত করছিল।
বাজার ছাড়লেও বর্তমান গ্রাহকদের জন্য আশার বাণী শুনিয়েছে ওয়ানপ্লাসের মূল প্রতিষ্ঠান ওপো। ওপো’র গ্লোবাল পিআর প্রধান শুয়াং চেন এক ব্রিফিংয়ে নিশ্চিত করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের বিদ্যমান ওয়ানপ্লাস গ্রাহকদের সমস্ত অধিকার—যার মধ্যে বিক্রয়োত্তর সেবা (আফটার সেলস সার্ভিস) এবং প্রমিজড সফটওয়্যার আপডেট অন্তর্ভুক্ত—তা সম্পূর্ণভাবে বজায় থাকবে।
তবে ওয়ানপ্লাস ব্যবহারকারীদের জন্য বড় পরিবর্তন আসছে অপারেটিং সিস্টেমে। আগামী মাসগুলোতে এই দুই অঞ্চলের ওয়ানপ্লাস ডিভাইসগুলোতে ওয়ানপ্লাসের নিজস্ব ‘অক্সিজেন ওএস’ (OxygenOS)-এর পরিবর্তে ওপো’র ‘কালার ওএস’ (ColorOS) রোলআউট করা হবে। ওপো ইউরোপের সিনিয়র পিআর ম্যানেজার জেমস প্যাটারসন জানান, ব্যবহারকারীরা কালার ওএস পছন্দ করবেন। তবে কোনো ব্যবহারকারী চাইলে ম্যানুয়ালি অক্সিজেন ওএস-এ ফেরত যেতে পারবেন, কিন্তু সেক্ষেত্রে তারা ভবিষ্যতের অফিশিয়াল আপডেটগুলো থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।
কর্পোরেট ভাষায় এটিকে একটি ‘কৌশলগত পরিবর্তন’ বলা হলেও, ভেতরের সমীকরণটি বেশ জটিল। বিশ্লেষকদের মতে, ওয়ানপ্লাস মূলত বহুমুখী সংকটের মুখে পড়েছিল। প্রযুক্তিপ্রেমীদের জন্য তৈরি বিশেষায়িত বা এনথুজিয়াস্ট ফোনের বাজার সংকুচিত হওয়া, অন্যান্য চীনা ব্র্যান্ডের সাথে তীব্র প্রতিযোগিতা, বাজারে অ্যাপল ও স্যামসাংয়ের একচেটিয়া আধিপত্য এবং বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে মোবাইল অপারেটরদের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখতে ব্যর্থ হওয়া এর অন্যতম কারণ। এর ওপর বিশ্বজুড়ে চলমান মেমোরি চিপ বা র্যাম (RAM) এবং প্রসেসর যন্ত্রাংশের তীব্র সংকট ওয়ানপ্লাসের ব্যবসাকে আরও কঠিন করে তোলে।
ওপো’র শুয়াং চেন বলেন, “এটি তড়িঘড়ি করে নেওয়া কোনো সিদ্ধান্ত নয়। ওপো ওয়ানপ্লাসকে নির্দেশ দেয়নি, আবার ওয়ানপ্লাসও একতরফা কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। একটি দায়িত্বশীল ব্র্যান্ড হিসেবে আমাদের জানতে হয় কখন পুরো শক্তি নিয়ে মাঠে নামতে হবে আর কখন বিকল্প বেছে নিতে হবে।”
ওয়ানপ্লাস বিদায় নিলেও ইউরোপের বাজারে নিজেদের উপস্থিতি আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা করেছে ওপো। ওপো ইউরোপের সিইও এলভিস ঝো জানান, ইউরোপ তাদের জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বাজার। সম্প্রতি বাজারে আসা ফাইন্ড এক্স৯ আল্ট্রা এবং রেনো ১৬ সিরিজের সফলতার পর ওপো ইউরোপে তাদের টিম এবং ফ্ল্যাগশিপ সিরিজের বিনিয়োগ আরও বাড়াবে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতাদের জন্য সুখবর নেই। এলভিস ঝো স্পষ্ট করেছেন যে, উত্তর আমেরিকার বাজারে ওপো’র নতুন কোনো পণ্য লঞ্চ করার এই মুহূর্তে কোনো পরিকল্পনা নেই। তবে মার্কিন ও ইউরোপীয় বাজারে ওয়ানপ্লাসের বর্তমান মজুত থাকা ফোনগুলো স্টক শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিক্রি করা হবে।
এই ঘোষণার মানে ওয়ানপ্লাস ব্র্যান্ডের চিরতরে বিলুপ্তি নয়। বহুল চর্চিত ওয়ানপ্লাস ১৬ এবং ১৬ প্রো বা আল্ট্রা মডেলগুলো এ বছরের শেষের দিকে বাজারে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে সেগুলো কেবল চীন ও এশিয়ার নির্দিষ্ট কিছু বাজারে সীমাবদ্ধ থাকবে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের ওয়ানপ্লাস ভক্তদের জন্য এখন বিকল্প হিসেবে সামনে আসছে ওয়ানপ্লাসের সাবেক সিইও কার্ল পেই-এর নতুন ব্র্যান্ড ‘নাথিং’ (Nothing)। এছাড়া ইউরোপের ক্রেতারা বিকল্প হিসেবে ওপো ফাইন্ড এক্স৯ আল্ট্রা, শাওমি ১৭ আল্ট্রা কিংবা অনর (Honor)-এর ফ্ল্যাগশিপ ফোনগুলো বেছে নিতে পারেন। অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অ্যান্ড্রয়েড প্রেমীদের এখন আগামী ১২ আগস্ট লন্চ হতে যাওয়া গুগলের পিক্সেল ১১ সিরিজের ওপরই ভরসা রাখতে হবে।


















