জাপানি মুদ্রা ইয়েনের টানা দরপতনের কারণে দেশটিতে নতুন স্মার্টফোনের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এর সরাসরি প্রভাবে সাধারণ ক্রেতাদের মধ্যে ব্যবহৃত বা পুরনো (সেকেন্ড হ্যান্ড) ফোনের চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে। প্রযুক্তি জায়ান্ট অ্যাপলের জনপ্রিয় আইফোনের দাম বাড়ার পরই দেশটির স্মার্টফোন বাজারে ক্রেতাদের কেনাকাটার এ নতুন প্রবণতা স্পষ্টভাবে সামনে এসেছে। খবর দ্য জাপান টাইমস।
গত ১৮ জুলাই জাপানের বাজারে আইফোনের সব মডেলের দাম একযোগে বাড়ানোর ঘোষণা দেয় অ্যাপল। এ ঘোষণার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে দেশটির ব্যবহৃত স্মার্টফোনের জনপ্রিয় অনলাইন প্লাটফর্ম নিকোসুমায় অর্ডার অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যায়। প্লাটফর্মটির তথ্য অনুযায়ী, দাম বাড়ানোর ঘোষণার পরদিন দুপুর নাগাদ তাদের ব্যবহৃত ফোন বিক্রির পরিমাণ আগের দিন এবং আগের সপ্তাহের একই সময়ের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি বাড়ে।
জাপানের খুচরা বাজারে কোনো একটি সুনির্দিষ্ট পণ্যের কারণে কেনাকাটার এমন আকস্মিক ঊর্ধ্বগতিকে বেশ বিরল ঘটনা হিসেবে দেখছেন বাজার বিশ্লেষকরা। টোকিওভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ও আইতোচু করপোরেশনের সহযোগী সংস্থা বিলংয়ের প্রধান বিপণন কর্মকর্তা ইউ তোমিতা বলেন, ‘জাপানি বাজারে এত কম সময়ে পুরনো ফোনের চাহিদা এভাবে বেড়ে যাওয়ার ঘটনা খুবই ব্যতিক্রমী। চার বছর আগে অ্যাপল যখন প্রথমবার আইফোনের দাম হুট করে অনেকটা বাড়িয়েছিল, ঠিক তখনই কেবল এমন চিত্র দেখা গিয়েছিল।’
অনলাইন বাজারের এ তীব্র কেনাকাটার জোয়ার কেবল সাময়িক কোনো বিষয় নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। নতুন প্রযুক্তির ডিভাইসের আকাশছোঁয়া দাম সাধারণ মানুষকে তুলনামূলক সাশ্রয়ী বিকল্প হিসেবে পুরনো বা রিফার্বিশড ফোনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অ্যাপল তাদের আইফোনের দাম মডেলভেদে ৮-২৫ হাজার ইয়েন পর্যন্ত বাড়িয়েছে। ফলে বর্তমানে তাদের সবচেয়ে সাশ্রয়ী সংস্করণ আইফোন ১৭ই-এর দামও ১ লাখ ইয়েন অতিক্রম করেছে।
প্রাথমিক দাম বাড়ার সংবাদের ধাক্কা কিছুটা সামলে উঠলেও অনলাইন প্লাটফর্মগুলোয় পুরনো ফোন বিক্রির গতি এখনো বেশ ঊর্ধ্বমুখী। বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, যারা এতদিন নতুন নাকি পুরনো ফোন কিনবেন, তা নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ছিলেন, দাম বাড়ার খবরে তারা চটজলদি পুরনো ফোন কেনার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। এছাড়া নতুন ফোনের দাম বাড়লে সেকেন্ড হ্যান্ড ফোনের বাজারেও দাম বেড়ে যেতে পারে, এমন আশঙ্কা থেকেও অনেক গ্রাহক তড়িঘড়ি করে ব্যবহৃত ফোন কিনছেন।
অর্থনীতিবিদ ও প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, জাপানি ইয়েনের রেকর্ড দরপতনই মূলত এ মূল্যবৃদ্ধির প্রধান কারণ। গত মাসের বড় একটা সময়জুড়ে প্রতি ডলারের বিপরীতে ইয়েনের বিনিময় হার ১৬২ অতিক্রম করেছিল, যা ১৯৮৬ সালের পর সর্বনিম্ন। ২০২২ সালের জুলাইয়ের পর এবারই প্রথম জাপানের বাজারে আনুষ্ঠানিকভাবে ফোনের দাম বাড়াল অ্যাপল। তখন প্রতি ডলারের বিনিময় হার ছিল ১৩৫-১৩৯ ইয়েনের মধ্যে।
টোকিওভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান এমএম রিসার্চ ইনস্টিটিউটের তথ্যানুযায়ী, গত বছরের সেপ্টেম্বরে আইফোন ১৭ সিরিজ উন্মোচনের পর বিশ্বের মধ্যে কেবল জাপান ও তুরস্কেই ফোনগুলোর দাম বাড়ানো হয়েছে। সংস্থাটির প্রধান গবেষক কেনসুকে হারা জানান, এক বছরের ব্যবধানে ডলারের বিপরীতে জাপানি ইয়েন এবং তুর্কি লিরার দর ১০ শতাংশের বেশি কমেছে। মুদ্রার এ বড় ধরনের দরপতনই কোম্পানিকে এসব দেশে পণ্যের দাম বাড়াতে বাধ্য করেছে।
জাপানের স্মার্টফোন বাজারে আইফোনের প্রভাব বেশ সুদৃঢ়। টানা ১৫ বছর ধরে দেশটির সবচেয়ে বিক্রি হওয়া ফোনের তালিকার শীর্ষে রয়েছে মার্কিন ব্র্যান্ডটি। ২০২৫ অর্থবছরে জাপানে অ্যাপলের মোট ফোন সরবরাহ আগের বছরের চেয়ে ৪ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়ে ১ কোটি ৬১ লাখ ৫০ হাজার ইউনিটে পৌঁছায়। এর মাধ্যমে দেশটির মোট স্মার্টফোন বাজারের ৫১ দশমিক ৬ শতাংশ হিস্যাই অ্যাপলের দখলে ছিল।
উদ্বেগের বিষয় হলো, আন্তর্জাতিক বাজারে মেমোরি চিপ ও প্রসেসরের উৎপাদন খরচ যেভাবে বাড়ছে, সে তুলনায় কেবল মুদ্রার বিনিময় হার হিসাব করে দাম বাড়ানো হয়েছে। ফলে আগামী দিনগুলোয় চিপের দাম না কমলে আইফোনের মূল্য আরো এক দফা বাড়তে পারে বলে আভাস দিয়েছেন বাজার বিশ্লেষকেরা। এটি ঘটলে দেশের সাধারণ ক্রেতারা নতুন ডিভাইস ছেড়ে আরো বেশি মাত্রায় বাজেটবান্ধব সেকেন্ড হ্যান্ড ফোনের দিকে ঝুঁকবেন।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জাপানে ব্যবহৃত ফোনের বাজার টানা সাত বছর ধরে বাড়ছে। ২০২৫ অর্থবছরে দেশটিতে প্রায় ৩৬ লাখ ১০ হাজার ইউনিট পুরনো ফোন বিক্রি হয়েছে, যা মোট স্মার্টফোন বাজারের প্রায় ১০ শতাংশ। এমএম রিসার্চ ইনস্টিটিউটের প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০২৯ অর্থবছর নাগাদ ব্যবহৃত ফোনের বিক্রি ৫০ লাখ ইউনিট ছাড়িয়ে যাবে এবং এটি মোট ফোন বাজারের ১৫ শতাংশের বেশি হিস্যা দখল করবে।
কেবল মূল্যস্ফীতি বা মূল্যবৃদ্ধিই নয়, দেশটির টেলিকম খাতের নীতিগত পরিবর্তনও পুরনো ফোনের চাহিদা বাড়াতে সাহায্য করেছে। আগে জাপানি ক্রেতারা টেলিকম অপারেটরদের কাছ থেকে দুই বছরের চুক্তিতে বাধ্যতামূলকভাবে নতুন নেটওয়ার্ক সংযোগসহ ফোন কিনতেন। কিন্তু ২০২০ সাল থেকে সরকারি উদ্যোগে টেলিকম খাতে প্রতিযোগিতা বাড়াতে এবং ইন্টারনেটের খরচ কমাতে নির্দিষ্ট নেটওয়ার্কে ফোন ‘লক’ করে রাখার নিয়ম নিষিদ্ধ করা হয়। ফলে গ্রাহকরা নিজেদের পছন্দমতো ফোন ও সিম কার্ড ব্যবহারের পূর্ণ স্বাধীনতা পান এবং সেকেন্ড হ্যান্ড ফোন কেনাকে সাশ্রয়ী পথ হিসেবে বেছে নেন।
বর্তমানে জাপানের প্রধান টেলিকম অপারেটরগুলো নিজস্ব ই-কমার্স প্লাটফর্মে সার্টিফায়েড বা মানসম্মত পুরনো ফোন বিক্রি করছে। তবে ব্যবহৃত ফোনের বাজারকে ধরে রাখতে হলে ফোনের বাহ্যিক অবস্থার পাশাপাশি ভেতরের যন্ত্রাংশ সঠিক আছে কিনা, তা নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করেন বিলংয়ের কর্মকর্তা ইউ তোমিতা। গ্রাহকের আস্থা বাড়াতে নিকোসুমা নিজেদের প্লাটফর্মে গুগল অনুমোদিত মেরামতের মাধ্যমে মান নিশ্চিত করা পিক্সেল ফোনও বিক্রি করছে।
পাশাপাশি সেকেন্ড হ্যান্ড বাজারে বহুবিধ ব্যবহারের সুযোগ থাকায় এর পরিধি দিন দিন বড় হচ্ছে। ফ্ল্যাগশিপ ফোন অনেক দামি হওয়ায় অনেকেই অল্প বাজেটে আগের প্রজন্মের ভালো মানের ফোন খুঁজছেন। অনেকে আবার গেমিং কিংবা অফিসের কাজের জন্য দ্বিতীয় ডিভাইস হিসেবে কম দামি স্মার্টফোন ব্যবহার করছেন। খাবার পরিবেশন করার রেস্তোরাঁগুলোয় ডিজিটাল অর্ডারের কাজেও বিপুল পরিমাণে সাশ্রয়ী পুরনো ফোন কেনা হচ্ছে। সর্বোপরি, জাপানি সমাজে এখন পুরনো জিনিস পুনর্ব্যবহারের প্রতি এক ধরনের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছে, যা ব্যবহৃত প্রযুক্তি পণ্যের বাজারকে টেকসই ভিত্তি দিচ্ছে।




















