আন্তর্জাতিক ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেসে অ্যাকাউন্ট ব্যবস্থাপনা, ব্যক্তিগত পরিচয় ও তথ্যের ব্যবহার, অর্ডার ও রিভিউ ব্যবস্থাপনা এবং মার্কেটপ্লেসের নীতিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়ে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান বিটোপিয়া (Betopia)-সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম যাচাইয়ের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (BASIS)।
অভিযোগের সত্যতা তদন্ত ছাড়া নির্ধারণ করা সম্ভব নয় উল্লেখ করে সংগঠনটি বলেছে, তবে অভিযোগগুলোর ধরন ও সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনায় বিষয়টি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
এক প্রেস বক্তব্যে BASIS বলেছে, বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সাররা দীর্ঘদিনের দক্ষতা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মার্কেটপ্লেসে দেশের ইতিবাচক অবস্থান তৈরি করেছেন। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের কারণে পুরো ফ্রিল্যান্সিং কমিউনিটি প্রশ্নের মুখে পড়ুক, তা তারা চায় না।
BASIS-এর ভাষ্য, প্রতারণা, ভুয়া পরিচয় ব্যবহার, ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার, ভুয়া অর্ডার, কৃত্রিম রিভিউ, মার্কেটপ্লেস ম্যানিপুলেশন কিংবা আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মের নীতিমালা লঙ্ঘনকে তারা সমর্থন করে না।
সদস্য হলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা
অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান BASIS-এর সদস্য হলে সংগঠনের গঠনতন্ত্র, সদস্য আচরণবিধি ও প্রযোজ্য নিয়ম অনুযায়ী বিষয়টি যাচাই করা হবে বলে জানিয়েছে সংগঠনটি।
প্রাথমিক যাচাইয়ে গুরুতর অনিয়মের বিশ্বাসযোগ্য উপাদান পাওয়া গেলে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সংশ্লিষ্ট সদস্যপদ সাময়িকভাবে স্থগিত করার বিষয় বিবেচনা করা হবে।
পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিস দিয়ে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সদস্যপদ স্থগিত, বাতিল কিংবা প্রয়োজনীয় অন্য সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
তবে BASIS বলেছে, অভিযোগ উঠলেই কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি গুরুতর অভিযোগ উপেক্ষা করাও দায়িত্বশীল আচরণ নয়।
সরকারি তদন্তে সহযোগিতার ঘোষণা
বিটোপিয়া-সংশ্লিষ্ট অভিযোগের বিষয়ে সরকারের বৈধ কোনো তদন্ত বা অনুসন্ধান হলে BASIS সহযোগিতা করবে বলেও জানিয়েছে।
সংগঠনটির বক্তব্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, আইসিটি বিভাগ, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (BFIU), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR), সাইবার অপরাধ সংশ্লিষ্ট সংস্থা, পুলিশ কিংবা অন্যান্য আইন প্রয়োগকারী ও নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান তথ্য বা সহযোগিতা চাইলে আইনগত সীমার মধ্যে তা দেওয়া হবে।
BASIS-এর কাছে প্রাসঙ্গিক কোনো সদস্যসংক্রান্ত রেকর্ড বা প্রাতিষ্ঠানিক নথি থাকলে যথাযথ প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তা দেওয়ার কথাও জানিয়েছে সংগঠনটি।
ক্ষতিগ্রস্তদের অভিযোগ জানানোর উদ্যোগ
কোনো ফ্রিল্যান্সার, সাবেক কর্মী বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি যদি মনে করেন তার NID, পাসপোর্ট, ব্যক্তিগত তথ্য কিংবা আন্তর্জাতিক মার্কেটপ্লেস অ্যাকাউন্ট অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা হয়েছে, অথবা তার অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ অন্য কোনো পক্ষের হাতে ছিল, তাহলে অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে BASIS।
এক্ষেত্রে অভিযোগের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক প্রমাণ সংগ্রহের ব্যবস্থাও থাকবে। তথ্যদাতাদের পরিচয় ও ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছে সংগঠনটি।
ফ্রিল্যান্সিং খাতে নীতিমালার দাবি
BASIS বলছে, ঘটনাটি কেবল একটি প্রতিষ্ঠান বা নির্দিষ্ট অভিযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সিং খাতের কিছু কাঠামোগত প্রশ্ন সামনে এসেছে।
বিশেষ করে কোনো ফ্রিল্যান্সারের নামে তৈরি আন্তর্জাতিক মার্কেটপ্লেস অ্যাকাউন্টের প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ কার কাছে থাকবে, কর্মীর NID বা পাসপোর্টের মতো ব্যক্তিগত তথ্য প্রতিষ্ঠান কীভাবে ব্যবহার করতে পারবে এবং চাকরি শেষ হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্ট ও ডিজিটাল পরিচয়ের মালিকানা কী হবে—এসব বিষয়ে স্পষ্টতা প্রয়োজন বলে মনে করছে সংগঠনটি।
একই সঙ্গে কোনো কোম্পানি বা এজেন্সি কতগুলো ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করতে পারবে এবং এজেন্সি পরিচালিত কার্যক্রম ও ব্যক্তিগত ফ্রিল্যান্সিংয়ের মধ্যে সীমারেখা কোথায় থাকবে, সে বিষয়েও নীতিমালা প্রয়োজন বলে মনে করছে BASIS।
এ লক্ষ্যে সরকারের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে ‘ন্যাশনাল ফ্রিল্যান্সিং অ্যান্ড মার্কেটপ্লেস গভর্ন্যান্স ফ্রেমওয়ার্ক’ তৈরির প্রস্তাব দেওয়ার কথা জানিয়েছে সংগঠনটি।
আন্তর্জাতিক মার্কেটপ্লেসের সঙ্গে সমন্বয়ের প্রস্তাব
আন্তর্জাতিক মার্কেটপ্লেস, সরকার, BASIS, ব্যাংক, পেমেন্ট সেবা প্রতিষ্ঠান এবং ফ্রিল্যান্সিং কমিউনিটির মধ্যে কার্যকর সমন্বয় ব্যবস্থা তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেছে সংগঠনটি।
পাশাপাশি ফ্রিল্যান্সারদের আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গ্রহণ, পেমেন্ট গেটওয়ের সীমাবদ্ধতা, ব্যাংকিং জটিলতা, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা, করসংক্রান্ত অস্পষ্টতা এবং ডিজিটাল পরিচয় সুরক্ষার মতো বিষয়গুলোর দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছে BASIS।
‘কারও পক্ষ নেবে না BASIS’
প্রেস বক্তব্যে BASIS বলেছে, বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সিং খাত কোনো একটি প্রতিষ্ঠানকে প্রতিনিধিত্ব করে না। কোনো ব্যক্তি বা কয়েকজনের অনিয়মের দায় পুরো ফ্রিল্যান্সিং কমিউনিটির ওপর বর্তানো উচিত নয়।
একই সঙ্গে সংগঠনটি আন্তর্জাতিক মার্কেটপ্লেস ও বৈশ্বিক ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের অধিকাংশ ফ্রিল্যান্সার নিয়ম মেনে সততা ও দক্ষতার সঙ্গে কাজ করছেন—এমন বার্তা পৌঁছে দেওয়ার কথা জানিয়েছে।
BASIS-এর বক্তব্য, কোথাও অনিয়ম হয়ে থাকলে তার নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া এবং দায়ী ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। একই সঙ্গে নিরপরাধ কর্মী, ফ্রিল্যান্সার বা প্রতিষ্ঠান যাতে অযথা হয়রানির শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
সংগঠনটি বলেছে, “BASIS কারও পক্ষ নেবে না। BASIS কোনো অভিযোগ ধামাচাপা দেবে না। BASIS কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে তদন্তের আগে অপরাধী হিসেবেও ঘোষণা করবে না।”
তাদের অবস্থান হলো—স্বচ্ছ তদন্ত, ন্যায়সংগত প্রক্রিয়া, ক্ষতিগ্রস্তদের সুরক্ষা এবং বাংলাদেশের আইটি ও ফ্রিল্যান্সিং খাতের সুনাম রক্ষা।
সরকার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, আন্তর্জাতিক মার্কেটপ্লেস, গণমাধ্যম ও ফ্রিল্যান্সিং কমিউনিটির সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে খাতটিকে আরও স্বচ্ছ, নিরাপদ এবং আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য করার লক্ষ্যেও কাজ করার কথা জানিয়েছে BASIS।




















