প্রযুক্তির আশীর্বাদের সাথে সাথেই আসে তার অভিশাপ। বাংলাদেশে এই অভিশাপের এক বড় নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে অবৈধ, অনিবন্ধিত এবং ক্লোন করা মোবাইল হ্যান্ডসেট। অনলাইন জুয়া, হাজার কোটি টাকার আর্থিক জালিয়াতি (ফ্রড), আইডি-ফ্রড (পরিচয় জালিয়াতি) থেকে শুরু করে চাঁদাবাজি ও রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড—এই প্রতিটি অপরাধের পেছনেই একটি সাধারণ হাতিয়ার হয়ে উঠেছে এই অবৈধ ফোন।
অপরাধীরা এই ফোনগুলো ব্যবহার করছে একটিমাত্র কারণে: পরিচয় গোপন রাখার স্বাধীনতা।
যখন একজন অপরাধী শুল্ক ফাঁকি দিয়ে আনা, ক্লোন আইএমইআই (IMEI) যুক্ত বা রিফারবিশড (পুরনো ফোনকে নতুন বলে চালানো) একটি ফোন ব্যবহার করে, তখন সে কার্যত রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার রাডারের বাইরে চলে যায়। তাকে ট্র্যাক করা বা তার অবস্থান শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো যখন তদন্তে নামে, তারা একটি ভুয়া নম্বর বা অস্তিত্বহীন আইএমইআই-এর ঠিকানায় গিয়ে থমকে দাঁড়ায়।
এই ভয়াবহ নিরাপত্তা ঝুঁকি উপলব্ধি করেই বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) অবশেষে একটি চূড়ান্ত পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে। চলতি বছরের ডিসেম্বরের পর থেকে ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিফিকেশন রেজিস্টার (NEIR) ব্যবস্থাটি পুরোপুরি সক্রিয় করার যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা অপরাধ দমনের ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ।
এনইআইআর (NEIR) যেভাবে অপরাধ কমাবে
এনইআইআর কোনো সাধারণ ডেটাবেস নয়; এটি একটি ‘ট্রিপল-রেজিস্ট্রি’ সিস্টেম। এই ব্যবস্থার অধীনে একটি ফোনের ১৫ ডিজিটের স্বতন্ত্র আইএমইআই নম্বরকে ব্যবহারকারীর জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) এবং তার ব্যবহৃত সিম কার্ডের সঙ্গে সংযুক্ত করা হবে।
এর ফলে যা ঘটবে: ১. যে ফোনের আইএমইআই নম্বর বিটিআরসি’র ডেটাবেসে নিবন্ধিত থাকবে না (অর্থাৎ, ফোনটি অবৈধভাবে দেশে প্রবেশ করেছে), সেই ফোনে কোনো মোবাইল অপারেটরের সিম কাজ করবে না। ২. একটি আইএমইআই ক্লোন করে একাধিক ফোনে ব্যবহার করা হলে মূল ফোনটি ছাড়া বাকিগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে নেটওয়ার্ক থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। ৩. চোরাই ফোনের অভিযোগ পাওয়ার সাথে সাথে সেই আইএমইআই ব্লক করে দেওয়া যাবে, ফলে ফোনটি আর দেশের কোনো নেটওয়ার্কে ব্যবহারযোগ্য থাকবে না।
কেন এই পদক্ষেপ অপরিহার্য?
১. অপরাধীর পরিচয় শনাক্তকরণ: এই সিস্টেম চালু হলে প্রতিটি সক্রিয় মোবাইল ফোনই কোনো না কোনো এনআইডি’র সাথে সংযুক্ত থাকবে। ফলে, কোনো ফোন থেকে অপরাধ সংঘটিত হলে সেই ফোনের আইএমইআই এবং সংশ্লিষ্ট এনআইডি’র মাধ্যমে অপরাধীকে শনাক্ত করা অনেক সহজ হবে।
২. অনলাইন জুয়া ও আর্থিক প্রতারণা বন্ধ: বর্তমানে অনলাইন জুয়ার সাইটগুলো এবং বিভিন্ন আর্থিক প্রতারক চক্র হাজার হাজার অবৈধ ফোন ও সিম ব্যবহার করে তাদের কার্যক্রম চালাচ্ছে। এনইআইআর চালু হলে এক এনআইডি’র বিপরীতে সীমিত সংখ্যক সিম এবং প্রতিটি সিম নির্দিষ্ট ফোনের সাথে ট্যাগ থাকার কারণে এই অপরাধী চক্রগুলোর কার্যক্রম চালানো রাতারাতি কঠিন হয়ে পড়বে।
৩. চোরাচালান ও রাজস্ব রক্ষা: অবৈধ ফোনের এই বিশাল বাজার শুধু অপরাধীদেরই অভয়ারণ্য নয়, এটি সরকারের রাজস্বেরও একটি বড় রক্তক্ষরণের নাম। কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে প্রতিদিন যে সেটগুলো বাজারে ঢুকছে, তা দেশীয় বৈধ মোবাইল শিল্পকেও ধ্বংস করে দিচ্ছে। এনইআইআর এই চোরাচালানের পথ সরাসরি বন্ধ করে দেবে।
৪. জননিরাপত্তা ও আস্থা: যখন একজন নাগরিক জানবে যে তার কেনা ফোনটি বৈধ এবং তার তথ্য সুরক্ষিত, তখন তা ডিজিটাল লেনদেনের প্রতি আস্থা বাড়াবে। অন্যদিকে, অপরাধীরা যখন বুঝবে যে প্রতিটি ডিভাইসই ট্র্যাক করা সম্ভব, তখন অপরাধ সংঘটনের আগে তারা দুবার ভাববে।
অতএব, কিছু বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জ থাকলেও, দেশের ডিজিটাল নিরাপত্তা, আর্থিক খাতের সুরক্ষা এবং জনশৃঙ্খলা বজায় রাখার স্বার্থে অবৈধ মোবাইল ফোনের এই রমরমা বাজার বন্ধ করার কোনো বিকল্প নেই। ডিসেম্বরের পর থেকে এনইআইআর কার্যকর করার এই সিদ্ধান্তটি শুধু রাজস্ব আদায় নয়, বরং এটি একটি নিরাপদ ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার পথে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপগুলোর একটি হতে চলেছে।






















