সরকার যখন অবৈধ মোবাইল ফোনের বাজার বন্ধে ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (এনইআইআর) ব্যবস্থা চালুর চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখনই এই উদ্যোগকে প্রতিহত করতে একটি শক্তিশালী মাফিয়া চক্র মাঠে নেমেছে বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগকারীরা দাবি করছেন, এই হাজার কোটি টাকার অবৈধ বাজার থেকে প্রতি মাসে বিপুল অংকের ‘কমিশন’ সরাসরি সাবেক সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে—সাবেক তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের কাছে পৌঁছাত।

আর সেই টাকার বিনিময়েই এই অবৈধ বাণিজ্যকে সুরক্ষা দিতে ২০২১ সালে এনইআইআর সিস্টেমের কার্যক্রম স্থগিত করে দেওয়া হয়েছিল। অভিযোগ, বিটিআরসি তখন অভিযান পরিচালনা করলেও পলক, জয় ও সালমানের সরাসরি নির্দেশে সেই কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।
এনইআইআর ঠেকাতে মাঠে নতুন ‘মাফিয়া’ সূত্রমতে, শুল্ক ফাঁকি দিয়ে হ্যান্ডসেট আমদানির এই অবৈধ কারবারের নেপথ্যে থাকা মাফিয়া চক্রের অন্যতম মূল হোতা হিসেবে ‘সুমাস টেক লিমিটেড’-এর সিইও আবু সাইদ পিয়াস এবং ‘টেক অ্যান্ড টক বিডি’-এর সিইও মোঃ আনিসুর রহমান সোহেলের নাম আলোচনায় এসেছে।

অভিযোগ, এনইআইআর ব্যবস্থা যাতে সফলভাবে বাস্তবায়িত না হতে পারে, সেজন্য তারা বিভিন্ন মহলে তদবির চালাচ্ছেন। কারণ এই সিস্টেমটি চালু হলে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে আনা অবৈধ বা ক্লোন করা হ্যান্ডসেটের ব্যবহার সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাবে।
গুজব ও অদ্ভুত যুক্তি এই চক্রের আরেক হোতা হিসেবে অভিযুক্ত টেক অ্যান্ড টক বিডির আনিসুর রহমান সোহেল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরাসরি সরকার এবং এনইআইআর নিয়ে বিভ্রান্তিমূলক তথ্য প্রচার করছেন। তিনি এক অদ্ভুত যুক্তিতে দাবি করেছেন, এনইআইআর চালু হলে চুরি যাওয়া ফোন আর উদ্ধার করা যাবে না, যা এই উদ্যোগের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে উসকে দিচ্ছে।

তার দাবি, “আপনার হারানো ডিভাইস চোর অথবা সে অপরাধী ব্যক্তি তার নিজের সিম কার্ডটা আপনার ডিভাইসে ব্যবহারই করতে না পারে তাহলে তো ফোনটা ভাংগারি হিসেবে বিক্রি করে দিবে… এজন্য আমরা এটার বিরোধিতা করি।”
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই যুক্তি সম্পূর্ণ ভ্রান্ত। এনইআইআর সিস্টেমের মূল উদ্দেশ্যই হলো চুরি যাওয়া ফোনকে অকার্যকর করে দেওয়া, যাতে চুরির প্রবণতা কমে।
জানা যায় বৈধ হ্যান্ডসেট বিক্রি করে এমন বেশি কিছু প্রতিষ্ঠানকে টার্গেট করে তাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে তারা । বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেখিয়ে তাদের কে আতঙ্কেরর ভিতরে রেখেছে অবৈধ কারবারিরা।
অভিযোগ উঠেছে যে, সালমান এফ রহমানের মালিকানাধীন বেক্সিমকো গ্রুপের সাথে শেয়ার দিয়ে ব্যবসা করছে দেশের বেশ কিছু জনপ্রিয় গ্যাজেট শপ। সালমান এফ রহমান, তার ছেলে আহমেদ শায়ান ফজলুর রহমান এবং এই ব্যবসায়ীদের নিয়েই অবৈধ মোবাইল ফোনের এক বিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হয়েছিল, যা সাবেক সরকারের আমলে পূর্ণ সুরক্ষা পেয়েছে।

ধ্বংসের মুখে দেশীয় শিল্প, বাড়ছে অপরাধ প্রযুক্তি বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সিন্ডিকেটের চোরাই হ্যান্ডসেটের অবাধ বাণিজ্যের কারণেই দেশি নির্মিত হ্যান্ডসেটের উৎপাদনে ধ্বস নেমেছে, যা ৪০ শতাংশেরও বেশি।
পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ তার চিত্র পাওয়া যায় ডিএমপির পরিসংখ্যানে। এক কর্মকর্তার মতে, দেশে প্রতিদিন গড়ে ১৮,৫০০ মোবাইল ফোন চুরি বা ছিনতাই হয়। এর মধ্যে মাত্র ৩০ শতাংশ উদ্ধার করা সম্ভব হয়, বাকি ৭০ শতাংশই এই অবৈধ বাজারে চলে যায়।
মোবাইল অপারেটররা বলছেন, এনইআইআর পুরোপুরি কার্যকর হলে নেটওয়ার্ক থেকে চোরাই হ্যান্ডসেট বিচ্ছিন্ন করা যাবে। একইসাথে, কিস্তি ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধায় ক্রেতার কাছে স্মার্টফোন সহজলভ্য করাও সম্ভব হবে।
কিন্তু এই রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের বিরুদ্ধেই মাঠে নেমেছে সেই সিন্ডিকেট, যারা অতীতে পলক, জয় ও সালমানের নামে ‘কমিশন’ দিয়ে এই অবৈধ বাণিজ্য চালু রেখেছিল বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্মার্টফোন বাজার বিশ্লেষণকারীদের মতে ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (এনইআইআর) ব্যবস্থা চালু না হলে সরকার শুধু রাজস্ব হারাবে না দেশ থেকে পাচার হবে বছরে ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি।






















