সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ও অপপ্রচার ছড়ানো এবং বিভিন্ন অ্যাপের মাধ্যমে ‘ঢাকা লকডাউন’ কর্মসূচি পালনে তৎপরতা চালচ্ছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ দল আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সংগঠনগুলো। সরকারের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থাসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, অতর্কিত ককেটেল বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ড ঘটিয়ে দুষ্কৃতকারীরা ঢাকাসহ সারাদেশে নৈরাজ্য সৃষ্টির চেষ্টা করছে। অতি গোপনে বিভিন্ন অ্যাপের মাধ্যমে স্থান নির্বাচিত ফ্যাসিবাদরা তাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালিত করছে।
ফলে ১৩ নভেম্বর কেন্দ্র করে সম্ভাব্য যে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে বিমানবন্দর, রেলস্টেশন, মেট্রোরেল স্টেশন, নৌ ও বাস টার্মিনালসহ সব ধরনের গণপরিবহন কেন্দ্র এখন কড়া নজরদারিতে রাখা হয়েছে। নিষিদ্ধ দলের নেতাকর্মীদের গ্রেফতারে নেওয়া হচ্ছে প্রযুক্তিগত সহায়তা। ঢাকার সব প্রবেশপথে বাড়ানো হয়েছে যাত্রী, লাগেজ স্ক্যানিং এবং সিসি ক্যামেরা মনিটরিং। মেট্রোরেল ও রেলস্টেশনগুলোর প্রবেশদ্বারে বাড়ানো হয়েছে আর্চওয়ে মেটাল ডিটেক্টর।
ডিএমপির এক কর্মকর্তা জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পর্যবেক্ষণ বাড়ানো হয়েছে। যে ধরনের তথ্য পাচ্ছেন সব ধরনের তথ্যকেই গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। বিভিন্ন মেসেঞ্জার ও হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ বিশ্লেষণ করে ইতোমধ্যে বেশকিছু দলীয় কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এদের টেলিগ্রাম অ্যাপ ব্যবহার বেশি করতে দেখা গেছে। সিগন্যালের মতো সিক্রেট অ্যাপও ব্যবহার করা হচ্ছে। আতঙ্ক ছড়াতে বট বাহিনী কাজ করছে। গ্রেফতার ব্যক্তিদের কাছ থেকে এ ধরনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। সে অনুযায়ী, যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে যারা অর্থায়ন করছে তাদেরও গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা প্রধান মো. শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, একজন নিরীহ রিকশাওয়ালাকে ৫শ টাকা দিয়ে স্লোগান দেওয়ানো হয়েছে। সেটা ভিডিও করে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেওয়া হয়। পরে ক্রাইম ডেটাবেজ বিশ্লেষণ করে দেখা যায় রিকশাচালকের কোনো অপরাধের তথ্য নেই। এভাবেই সোশ্যাল মিডিয়া থেকেও আতঙ্ক ছড়ানো হচ্ছে।
তবে আওয়ামী লীগের ১৩ নভেম্বরের ঘোষিত কর্মসূচি নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই উল্লেখ করে যে কোনো ধরনের নাশকতা সামাল দেওয়ার সক্ষমতা ডিএমপি’র আছে বলে নগরবাসীতে আশ্বস্ত করেছেন ডিএমপি কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী। নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থেই কোনো আগন্তুককে সন্দেহজনকভাবে দেখলে থানায় অথবা ৯৯৯ ফোন করার অনুরোধ করেছেন তিনি।
একইভাবে সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো প্রোপাগান্ডায় বিভ্রান্ত হয়ে কেউ যাতে বিশৃঙ্খল কার্যক্রম চালাতে না পারে, সেজন্য পুলিশ সতর্ক রয়েছে বলে জানিয়েছেন পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) খন্দকার রফিকুল ইসলাম। ফেসবুক ও ইউটিউব থেকে প্রাপ্ত তথ্যকে গুরুত্ব দিয়ে ডিএমপির পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে বলা হয়েছে জানিয়েছেন ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এসএন মো. নজরুল ইসলাম।
ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট পুলিশের (এমআরটি) ডিআইজি সিদ্দিকী তানজিলুর রহমান জানিয়েছন, মেট্রোরেলের সব স্টেশনে নিরাপত্তায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন ও সার্ভিলেন্স বাড়ানো হয়েছে।
প্রযুক্তি ব্যবহারে অপরাধ পরিচালনার বিষয়ে পুলিশ সতর্ক জানিয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান (ডিবি) মো. শফিকুল ইসলাম বলেছেন, ফ্যাসিবাদ গোষ্ঠীরা বিভিন্ন অ্যাপসের মাধ্যমে সাংগঠনিক কার্যক্রম চালাচ্ছে। বিশেষ করে টেলিগ্রাম অ্যাপ ব্যবহার করছে বেশি। সেখানে তারা নির্দেশনা দেয়, যে অমুক জায়গায় জড়ো হতে হবে। সেই নির্দেশনা অনুযায়ী তারা ২-১ মিনিটের মধ্যে সড়কে মিছিলের করে সেটা ভিডিওতে ছড়িয়ে দেয়। এছাড়া বিভিন্ন স্থানে ককটেল বিস্ফোরণ এই ফ্যাসিবাদরাই ঘটিয়েছে। এই সব ফ্যাসিবাদী অপরাধীদের গ্রেফতারের পরে অ্যাপসের মাধ্যমে কার্যক্রম বিষয়টি সামনের দিকে আসে। ডিবি সব ধরনের কার্যক্রম প্রতিহত করে যাচ্ছে এবং অ্যাপস গুলোকে মনিটরিং করা হচ্ছে।
অপরদিকে কখন কোথায় ককটেল বিস্ফারণ হয়, আগুন লাগানো হয়, সেই শঙ্কায় গত দুদিন ধরেই অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করছিলেন। তারা বৃহস্পতিবার (১৩ নভেম্বর) প্রতিষ্ঠান বন্ধের সিদ্ধান্ত চান। কারণ তারা জেনেছেন, রাজধানীতে যখন-তখন ককটেল বিস্ফারণ ঘটছে। পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসও। বুধবার (১২ নভেম্বর) প্রায় সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় জরুরি ক্লাস অনলাইনে করার কথা জানিয়ে দেয়। কেউ কেউ কৌশলে ‘অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির জন্য কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না’ উল্লেখ করে নোটিশ দিয়েছে। এছাড়া অনেক স্কুলের ক্লাস পরীক্ষাসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতার তারিখ পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। ছুটির নোটিশ পাঠিয়ে দিয়েছে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলো। যদিও সরকারি কোনও স্কুলে এ ধরনের কোনও সিদ্ধান্তের কথা জানা যায়নি। এদিকে, বুধবার সন্ধ্যায় প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে অনলাইনে ক্লাস বাতিল করার নোটিশ জারি করা হয়। ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের অভিভাবক দিনা আশরাফ স্কুলটির নামে চালু করা একটি ফেসবুক গ্রুপে লিখেছেন, ‘স্কুল কর্তৃপক্ষের কাছে বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছি, সরকারি নির্দেশনার অপেক্ষায় না থেকে আমাদের সবার বাচ্চাদের নিরাপত্তার স্বার্থে আগামীকাল ১৩ নভেম্বর স্কুলটা বন্ধ রাখলে ভালো হতো।’ উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের স্কুল শাখার একটি শ্রেণির অভিভাবকদের একটি গ্রুপে শিক্ষকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ‘আগামীকাল ১৩/১১/২৫ তারিখ দেশের সার্বিক অবস্থা বিবেচনা করে শিক্ষার্থীদের স্কুলে পাঠানোর জন্য অভিভাবকদের বলা যাচ্ছে না। কোনোরূপ অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার দায়ভার বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নেবে না।’
রাজনীতিবিদ ও রাজনীতির বিশ্লেষকরা বলছেন, আতঙ্ক ছড়ালেও জ্বালাও- পোড়াও করে এখন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সমর্থন পাওয়া যাবে না। এমন প্রেক্ষাপটে ১৩ নভেম্বর, বৃহস্পতিবার দুপুরে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিতে আসছেন। তার ভাষণে কী থাকবে, গণভোট কবে হবে সেই বিষয়ে সুস্পষ্ট ঘোষণা থাকবে কি না এবং মানবতাবিরোধী ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনার বিচারের রায়ের তারিখ ঘোষণা নিয়ে সবার মধ্যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি ককটেল নিক্ষেপ ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় জুলাই আন্দলনের সময় দেয়া তৎকালীণ প্রধানমন্ত্রী ও পতিত সরকার প্রধান শেখ হাসিনার বিভিন্ন ভিডিও বক্তব্য সোশ্যাল মিডিয়ায় নতুন করে শেয়ার করা হচ্ছে। আগে নিজের দলের কর্মীরা যেই ভিডিও শেয়ার করতেন এখন তার প্রতিপক্ষরাও সেই ভিডিও শেয়ার করছেন।






















